রেদওয়ানুল হক মিলন-এর কলাম “মৃত্যু কি সহজ” !

মৃত্যু কি সহজ!
রেদওয়ানুল হক মিলন

০৯ আগষ্ট রবিবার আমার জন্মদিন ছিল। শনিবার রাত থেকেই বন্ধু-বান্ধবরা, স্বজনরা আমাকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছিলেন। তাদের ভালোবাসায় মুগ্ধ হয়ে অনেক রাতে ঘুমাতে গিয়েছি। ২০০০ সালের ০৯ আগষ্ট  বৃস্প্রতিবার জল-জোছনার শহর ঠাকুরগাঁওয়ের সদর উপজেলা আকচা গ্রামে ছায়াসুনিবিড় বাড়িতে বাবা-মায়ের তৃতীয় সন্তান হিসেবে আমি জন্মেছিলাম।ছবির মতো সাজানো গ্রামীণ শহরের চারপাশজুড়ে সবুজ শ্যামল।গ্রামের বুক চিরে বইছে টাঙন। হিমালয়ের কোলে শুয়ে থাকা ঠাকুরগাঁয়ের বাড়িতে আমাদের তিন ভাই-বোনের সংসার ছিল আনন্দের। সংসারে টানাপড়েন ছিল।কিন্তু উপচে পড়া সুখও ছিল।

পারিবারিক ভাবে জম্মের পর থেকে মা-বাবা ও বড় ভাই-বোনদের কোরআন তিলাওয়াতে ঘুম ভেঙেছে।মাগরিবের নামাজ পড়ে পড়তে বসা সেই ছেলে-বেলার অভ্যাস ছিল।মহান আল্লাহর প্রতি গভীর বিশ্বাস ও আনুগত্যে কখনো আমার মনে দ্বিধা আসেনি।জম্মসূত্রেই নয়, বিশ্বাসেও আমি একজন মুসলমান।কিন্তু শৈশব থেকে পরিবার, সমাজ আমাকে সব ধর্মের বন্ধু-বান্ধব প্রিয়জনদের সাথে আত্মিক বন্ধনে বেড়ে উঠতে শিখিয়েছে।ধর্মের নামে, বর্ণের নামে জাতপাতের নামে মানুষকে শোষণ-নিপীড়ন বা হত্যার আমি বিরোধী।

এই ছোট্ট জীবনে কখনো কার সাথে ধর্মীয় কারণে ঝগড়া-বিবাদ, মনোমালিন্য বা বিরোধ যেমন হয়নি তেমনি আর হবেও না। বরং আত্মীয়-স্বজন থেকে নিজ ধর্মের অনেকের সাথে আমার বিভিন্ন কারণে বিভিন্ন সময়ে বিরোধ হয়েছে। মনোমালিন্য হয়েছে।আমি ধর্মে বিশ্বাসী মুসলমান হলেও কোনো দিন কোনো ধর্মের প্রতিকটাক্ষ যেমন করিনি, তেমনি কোনো ধর্মের প্রতি অসম্মানও করিনি।কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার হীনমন্যতায় কখনো আমিভুগিনি। বরং ধর্মান্ধ অনেক আত্মীয়-স্বজনের সাথে বিভিন্ন  কারণে আমার সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। অকালে মা,বাবা চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন।আমরা তিন ভাই-বোন বেঁচে আছি।

শিশুকালে খুব চঞ্চল ছিলাম। যখন হাঁটতে শিখেছি কোনো পুকুর, খাল-বিলে ডুবে না মরি তাই বাবা কোমরে ঘুঙুর বেঁধে দিয়েছিলেন।কৈশোরে ছিলাম দুরন্ত ডানপিটে। পরিবার, স্কুল, পাড়া-পড়শি সবাইকে জ্বালিয়ে মেরেছি।আমাদের সময় শুধু পরিবারের অভিভাবকরাই স্নেহ শাসনে রাখ না। পাড়া-পড়শি, আত্মীয়-স্বজনদের ছায়াও ছিল কঠোর।মুরুব্বিদের প্রতি সম্মান ও ভয় ছিল সীমাহীন।

অতীতের কথা মনে হলে স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ি। শিশুকালের সময়টা আমাকে গভীর ভাবে টানে।এখনো মুষলধারে বৃষ্টি নামে বর্ষায় আমাদের শহরে।হিমালয়ের কোলে শুয়ে থাকা ঠাকুরগাঁওয়ের শীত ও বৃষ্টি এখনো মুগ্ধ করে।গ্রামের ধূলিকণা গায়ে মাখা পথে কত রাত বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতেঘরে ফিরেছি।প্রেমের শহর, গানের শহর, আড্ডার শহর আমাদের প্রিয় ঠাকুরগাঁও।

সত্যই আমার কাছে বড় আর নিরপেক্ষতা আমার কাছে নির্বাসিত।বিশ্বনন্দিত লেখক কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমার সব বেদনারশক্তির আশ্রয়।আর আমার ভিতরে বাস করা বাংলাদেশের সুমহান মুক্তিযোদ্ধের সর্বাধিনায়ক জাতির মহত্তর নেতা, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সব সাহসের উৎস।অগণিত পাঠকের ভালোবাসা, আস্থা-বিশ্বাস আমার দায়বদ্ধতার জায়গা।আমার স্বভাব হলো কোথাও ভালোবাসা পেলে বারংবার সেখানে ছুটে যাই। কেউ বিরক্ত হলে ভুলেও সেদিকে পা বাড়াই না।কাউকে পছন্দ না হলে তার দিকে ফিরেও তাকাই না।কৌশলী হওয়ার শব্দটি আমার চরিত্রের সঙ্গে খাপ খায় না।
 
অনেকে বলেন আবেগ আমার শত্রু আমি বলি, আবেগ আমার শক্তি। প্রিয়জনদের উপর রাগ করলেও তা সাময়িক। এবং সেই মেজাজ খুব ক্ষণস্থায়ী হয়।বিষ পুষে রাখা আমার স্বভাবে নেই।আমারও কবির মতো একটি কোমল হৃদয় আছে।সেখানে অন্তহীন তৃষ্ণা, অতৃপ্তি ক্ষত ও দহন রয়েছে।মাঝে মাঝে আপস করে বেঁচে থাকার নীতি আমাকে ক্লান্ত, বিষাদগ্রস্ত করে। প্রেমহীন মায়া-মমতাহীন, স্বার্থপর নষ্ট সমাজ আমাকে নিঃসঙ্গ করে দেয়।

আমি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সত্য সে যে কঠিন, কঠিনেরে ভালবাসিলাম নীতিতে পথ হাঁটার চেষ্টা করি।আমি তাঁর যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলোরে, হৃদয়ের ডাক গ্রহণ করি।
মানুষের জীবনটা আসলেই অদ্ভুত। এই করোনা মহামারির মাঝেও এ অদ্ভুত জীবনে আমাদের কত ধরনের লড়াই করে কাটাতে হয়।অনেক সময় আমরা সুখের জন্য লড়াই গিয়ে অসুখকে ডেকে আনি। মনের স্বস্তির জন্য অস্বস্তিকে আশ্রয় দেয়।সুখ, স্বপ্ন ও বাস্তবতা আসলেই আলাদা। যশ, খ্যাতি, অর্থ-বিত্ত কোনোটাই সুখ এনে দিতে পারে না।

মৃত্যু কি সহজ, কি নিঃশব্দে আসে অথচ মানুষ চিরকালই জীবন নিয়ে গর্ব করে যায়। এই বৈশ্বিক মহামারিকালেও মানুষ গর্ব আর অহংকারে মাটিতে পা ফেলে না। তাই বলি গর্বের কিছু নেই।চলে গেলে সব শেষ। মানুষ একাই আসে, একাই যায়।সঙ্গে কেউই যায় না। কিছুই থাকে না।মৃত মানুষের নামাজে জানাজা কিংবা শোকের বাড়িতেও মানুষ ব্যস্ত  থাকে নিজেদের আলোচনাতেই।কারণ, যিনি মারা গেছেন তিনি তখন সবার কাছেই লাশ হিসাবে পরিচিত মানুষ আর নন। লাশকে দ্রুত দাফন করে সবাই ফিরতে চায় আপন আনন্দ ভুবনে।এই ভুবনে বিদায়ী মানুষের আর ঠাঁই থাকে না। এক কবি বলেছেন, মানুষের শোকের আয়ু বড়জোর এক বছর।বাস্তবে এ আয়ু এখন মাসও পার হয় না।মানুষ ভুলে যায় সবকিছু।বর্তমান হয়ে যায় অতীত।

২০বছর আগে মাত্র চার মাস বয়সে মা, আর ৯ বছর বয়সে বাবাকে হারিয়েছি তাই প্রতি বছর ২০ ডিসেম্বার, ৭ই ফেব্রুয়ারি বেদনাবিধুর শোকাবহ স্মৃতির দিন হিসাবে প্রতিবছরই স্মরণ করি। ৭ফেব্রুয়ারী বেদনাবিধুর শোকাবহ দিনটি সামনে রেখে একই মাসে আরও ৫ জন প্রিয় মানুষকে হারিয়েছি। ভালো মানুষ বেশিদিন থাকেনা চলে যান।দুনিয়ার অশান্তি তাদের ভালো লাগেনা তাই তারা চলে যায়।প্রিয়জনদের মৃত্যু আমাকে এখন কাঁদায়।মায়ের মৃত্যুর সময় আমার বয়স সবে মাত্র চার মাস তাই

Share Button