জাফর আহমেদ:
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে দীর্ঘমেয়াদে হস্তান্তরের উদ্যোগের তীব্র সমালোচনা করেছেন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। তিনি বলেছেন, ‘আমাদের সক্ষমতা নেই’—এমন যুক্তি দেখিয়ে দেশের তরুণদের ৫৪ বছর ধরে প্রতারণা করা হয়েছে। উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়া কৌশলগত এই অবকাঠামো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে তুলে দেওয়া হলে রাষ্ট্র বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
মঙ্গলবার জাতীয় প্রেসক্লাবে মিডিয়া অ্যান্ড সিভিল রাইটস সোসাইটি আয়োজিত ‘চট্টগ্রাম বন্দর ও জাতীয় স্বার্থ’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন।
আনু মুহাম্মদ বলেন, আওয়ামী লীগ আমলে আলোচনায় থাকা ডিপি ওয়ার্ল্ডের নাম আবারও এনসিটি পরিচালনার ক্ষেত্রে সামনে আসা বর্তমান সরকারের জন্য লজ্জার বিষয়। প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়া রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দায়িত্ব দেওয়া হলে তা রাষ্ট্রের জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে।
আলোচনায় উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে বলা হয়, এনসিটি সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে নির্মিত। এতে সরকারি বিনিয়োগ হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৭১২ কোটি টাকা। পরবর্তী সময়ে আরও প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৪টি কুই গ্যান্ট্রি ক্রেন ও ৩৩টি আরটিজি যুক্ত করা হয়েছে।
প্রবন্ধ অনুযায়ী, দেশীয় ব্যবস্থাপনায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এনসিটি ১৩ লাখ ৮৫ হাজার টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডলিং করেছে, যা জার্মান পরামর্শকের নির্ধারিত ১১ লাখ টিইইউ সক্ষমতার চেয়ে প্রায় ২৬ শতাংশ বেশি। চলতি বছরের মে মাসে এক মাসে ১ লাখ ২৬ হাজার ৪৯৬ টিইইউ হ্যান্ডলিং করে টার্মিনালটি রেকর্ড করেছে।
প্রবন্ধে আরও বলা হয়, এনসিটি হস্তান্তরের প্রস্তাবে ‘অপারেটর’ থেকে ‘কনসেশনিয়ার’ কাঠামোয় পরিবর্তন, স্তরভিত্তিক রয়্যালটি এবং ১৫ বছরের আর্থিক মডেলের পরিবর্তে ৩০ বছরের মেয়াদের বিষয়টি সামনে এসেছে। এতে প্রতি কনটেইনারে বন্দরের নিট প্রাপ্তি ৬৫ দশমিক ২৫ ডলার থেকে কমে ১৭ দশমিক ১৮ ডলারে নামতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে। এর ফলে বছরে প্রায় ৮০০ কোটি, ১৫ বছরে ১২ হাজার কোটি এবং ৩০ বছরে প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ রাজস্ব পার্থক্য হতে পারে।
প্রস্তাবিত বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ ২০৫ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। তবে এই অর্থ কোন খাতে ব্যয় হবে, তা নিয়ে প্রবন্ধে স্পষ্টতার অভাবের কথা বলা হয়েছে।
আলোচনায় বক্তারা বলেন, এনসিটি হস্তান্তরের প্রশ্নটি শুধু দেশি-বিদেশি বিভাজনে দেখলে চলবে না। মূল প্রশ্ন হলো—কোন শর্তে, কত বছরের জন্য, কতটা স্বচ্ছতার সঙ্গে এবং শেষ পর্যন্ত কার স্বার্থে টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তারা কৌশলগত অবকাঠামো ব্যবস্থাপনায় উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক দরপত্র, সর্বোচ্চ ১৫ বছরের কনসেশন, বিদেশি বিনিয়োগে দেশীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকানা, প্রযুক্তি হস্তান্তর, তথ্যের নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রের হাতে রাখা এবং চুক্তির খসড়া প্রকাশের দাবি জানান। একই সঙ্গে একই অপারেটরকে একই বন্দরে একাধিক কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার সুযোগ না দেওয়ার প্রস্তাবও দেওয়া হয়।
চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা কমিটির নেতা শেখ নুরুল্লাহ বাহার বলেন, বন্দর ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে তুলে দেওয়া হলে শ্রমিকদের আন্দোলন সামাল দেওয়া কঠিন হবে। শ্রমিকদের আশঙ্কা, দীর্ঘমেয়াদি লিজ হলে বাংলাদেশি শ্রমিকদের অধিকার ক্ষুণ্ন হতে পারে।
বক্তারা সতর্ক করে বলেন, ভুল দরপত্র বা বিনিয়োগ পরে সংশোধন করা সম্ভব হলেও ৩০ বছরের আন্তর্জাতিক কনসেশন চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন। তাই এনসিটি নিয়ে সিদ্ধান্তের আগে সব শর্ত প্রকাশ, জনস্বার্থ যাচাই ও পূর্ণাঙ্গ জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
