জাফর আহমেদ, কুড়িগ্রাম জেলা সংবাদদাতা:
নদী পেরিয়ে স্কুলে যাওয়ার সামর্থ্য নেই, কাছে কোনো মাধ্যমিক বিদ্যালয়ও নেই—তাই প্রাথমিকের গণ্ডি পেরোতেই থেমে যাচ্ছে কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলের হাজারো শিশুর শিক্ষার স্বপ্ন। চার শতাধিক চর ও দ্বীপচরের মধ্যে মাত্র পাঁচটিতে রয়েছে এমপিওভুক্ত মাধ্যমিক বিদ্যালয়। আরও দুই চরে রয়েছে মাদ্রাসা। বাকি ৩৯৫ চরে মাধ্যমিক শিক্ষার কোনো ব্যবস্থা নেই। এর সুযোগে বাড়ছে শিক্ষার্থী ঝরে পড়া, শিশুশ্রম ও বাল্যবিবাহ।
জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ২৫ লাখ মানুষের কুড়িগ্রামে চরাঞ্চলে বাস করেন পাঁচ লাখের বেশি মানুষ। নারায়ণপুর, অষ্টমীরচর, নয়ারহাট, চর রাজিবপুর ও কোদালকাটি ইউনিয়নের চরাঞ্চলে পাঁচটি এমপিওভুক্ত মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে। ব্রহ্মপুত্র, ধরলা ও তিস্তা নদীবেষ্টিত দুর্গম ৩৯৫টি চরে নেই কোনো মাধ্যমিক বিদ্যালয়।
সম্প্রতি ঝুনকারচর, গোয়ালপুরি চর, মেকুরের আলগা, চিড়াখাওয়া, আইরমারীর চর, পূর্ব দইখাওয়ার চর, মশালের চর, জাহাজের আলগার চর, সুখের বাতির চর ও ঘুঘুমারির চর ঘুরে দেখা যায়, এসব চরের পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যেও কোনো মাধ্যমিক বিদ্যালয় নেই।
যাত্রাপুর ইউনিয়নের রলাকাটার চরের শিক্ষার্থী ফাতেমা খাতুন (১৬) বলেন, প্রাথমিকের পর আশপাশের চর থেকে ১২ জন মেয়ে যাত্রাপুরে ভর্তি হয়েছিল। এখন তাঁরা মাত্র চারজন। বাকিদের বিয়ে হয়ে গেছে। চর থেকে স্কুলে যেতে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা লাগে। নৌকা ভাড়া যাওয়া-আসায় দৈনিক ৪০ টাকা। তাঁর বান্ধবী মহিমা আক্তারের (১৬) এসএসসি পরীক্ষার ছয় মাস আগে বিয়ে হয়েছে।
উলিপুরের আইরমারী চরের শিমু আক্তার (১২) ঘোগাদহ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ছে নানির বাড়িতে থেকে। তার ভাষ্য, যাদের শহরে আত্মীয়ের বাড়ি নেই, তাদের অনেকেই পড়ালেখা ছেড়ে দিয়েছে।
সদরের খাসের চরের ইব্রাহীম (১৪) ২০২২ সালে প্রাথমিক পাশ করে মাধ্যমিকে ভর্তি হলেও টাকার অভাবে পড়াশোনা চালাতে পারেনি। এখন বাবা-চাচার সঙ্গে হালচাষ করে। তাঁর ভাষায়, “চরে তো হাই স্কুল নাই, প্রাইমারী পাশের পর ফির লাঙ্গল ধরা নাগে।”
নিজ উদ্যোগে রলাকাটার চর আদর্শ নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছেন মো. মনির হোসেন। তিনি বলেন, অধিকাংশ চরশিক্ষার্থী প্রাথমিকের পর ঝরে পড়ছে। কয়েকটি কাছাকাছি চর মিলে মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপন এবং নন-এমপিওভুক্ত বিদ্যালয়গুলো এমপিওভুক্ত করার দাবি জানান তিনি।
কুড়িগ্রাম জেলা শিক্ষা অফিসার মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, চরাঞ্চলে স্কুলের সংকট রয়েছে। প্রাপ্যতা অনুযায়ী মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হলে ঝরে পড়া কমবে এবং বাল্যবিবাহ বন্ধে সহায়তা করবে। ভগবতিপুর চরে সম্প্রতি একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় তৈরি হয়েছে এবং প্রথম আলো চরে একটি নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পাঠদান চলছে। নন-এমপিওভুক্ত বিদ্যালয়গুলো এমপিওভুক্তির জন্য সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার স্বপন কুমার জানান, জেলায় প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ১ হাজার ৩৮২টি। চরাঞ্চলের শিক্ষার মান উন্নয়নে শিক্ষকদের শতভাগ উপস্থিতি নিশ্চিতের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
জেলা চর উন্নয়ন কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইয়েদ আহমেদ বাবু বলেন, “মাধ্যমিক শিক্ষার সুযোগ না থাকায় অনেক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে। মেয়েদের বাল্যবিবাহ আর ছেলেদের শিশুশ্রম সেখানে বাড়ছে।” কয়েকটি কাছাকাছি চর মিলে মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপনের জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানান তিনি।
