কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি:
জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাবে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের সীমান্তবর্তী জেলা কুড়িগ্রামের চরাঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে আসছে। বিশেষ করে এই জেলার যাত্রাপুর, রমনা, ভোগডাঙ্গা, বেলগাছা, নাগেশ্বরী, ভূরুঙ্গামারী ও চিলমারীর বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল ও নদী নিকটবর্তী গ্রাম গুলো বারবার নদীভাঙন, সময়-অসময়ের বন্যা ও চরম আবহাওয়ার কারণে বিপর্যয়ের মুখে পড়ছে। আর সেই বাস্তবতা সামনে এনে এবার সরব হয়েছেন স্থানীয় তারুণ্য ও চর বাসীরা।
শুক্রবার (১৫ আগস্ট) বিকেলে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের ভাঙনপ্রবণ বানিয়াপাড়া গ্রামের মানুষ নদীর পাড়ে অবস্থান নিয়ে কন্ঠস্বর তুলে ধরেন।
এই মানববন্ধনের আয়োজন ও নেতৃত্ব দেন স্থানীয় চরভিত্তিক গবেষণা ও অধিকার আন্দোলনের প্ল্যাটফর্ম ‘জাস্টিস ফর চর’স অ্যান্ড লোকাল রিসার্চ’ (JFCLR)। এই কর্মসূচিতে সকল বয়সের শতাধিক নারী, পুরুষ, তরুণ, কিশোর ও শিশুরা অংশগ্রহণ করেন যারা প্রত্যক্ষভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীরা প্ল্যাকার্ড ও ফেস্টুন হাতে জানান তাদের জীবনের করুণ বাস্তবতা।কর্মসূচিতে যোগ দিতে আসা বৃদ্ধা আমিরন বেওয়া বলেন, প্রতি বছর একচালা ঘরটা পেছনে সরাতে সরাতে আর জায়গা থাকে না। এখন আর ঘর তোলার জায়গাও নেই।
রাজু নামের এক শিক্ষার্থী বলেন,পড়াশোনা করতে পারছি না। পরিবারে আয় স্বল্প, এভাবে পড়াশোনা হয়না এখানে ,এখন ভবিষ্যতের কোনও স্বপ্নও নেই।
মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীরা স্পষ্ট বার্তা দেন জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি সর্বশান্ত করে দিচ্ছে। টিকে থাকার জন্য সময় উপযোগী বরাদ্দ প্রয়োজন । স্থানীয় অভিযোজনের অংশ হিসেবে কৃষি, ঘরবাড়ি পুনর্বাসন, নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যসেবা এবং বিকল্প জীবিকার ওপর জোর দিতে হবে।
যাত্রাপুর ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান রহিমুদ্দিন হায়দার রিপন মানববন্ধনে বলেন, যাত্রাপুরের বাজার থেকে শুরু করে বিস্তীর্ণ বসতিপাড়া এখন হুমকির মুখে। ব্রহ্মপুত্রের ভাঙন রোধে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। শুধু বাঁধ দিলেই হবে না, চাই বিজ্ঞানসম্মত অভিযোজন পরিকল্পনা। সরকারি ও আন্তর্জাতিক সহায়তা যেমন প্রয়োজন,তেমনি স্থানীয় তরুণদের নেতৃত্বকেও সম্পৃক্ত করে এগিয়ে যেতে হবে।
সংগঠনটির পরিচালক স্বপন কুমার সরকার বলেন, বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি। কুড়িগ্রাম তার ভুক্তভোগী জেলাগুলোর অন্যতম। এখানকার মানুষরা নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার করছে,কিন্তু এনারাই সবচেয়ে বড় ভিক্টিম। আমাদের জাতীয় বরাদ্দ সহ আন্তর্জাতিক হিস্যা এলএলএ ফান্ড প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে। তার সঙ্গে ন্যায্য লস এন্ড ড্যামেজ অর্থায়ন।
তিনি আরও বলেন,দীর্ঘমেয়াদি বাজেট বরাদ্দ ও উন্নয়ন গবেষণা এবং সঠিক নেতৃত্ব একমাত্র এ সমস্যাগুলোকে সামলে নিতে পারে।
এই মানববন্ধনে উপস্থিত ছিলেন, কো-অর্ডিনেটর রাজু আহমেদ, শাকিল ইসলাম, মাসুদ রানা, শাহিন ইসলাম। স্থানীয় নারীদের মধ্যে ছিলেন রাবেয়া খাতুন, আয়েশা সিদ্দিকা, বিলকিস বেগম, হালিমা খাতুনসহ আরও অনেকে। এছাড়াও গ্রামের শতাধিক নারী, পুরুষ ও শিশু এই কর্মসূচিতে অংশ নেন।
মানববন্ধনে চরবাসী ও তারুণ্যরা বিশ্বনেতাদের প্রতিও পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য আহ্বান জানান। তারা বলেন, আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলনগুলোতে কোটি কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতি আসে,কিন্তু ওগুলো আলোচনা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকছে, কিন্তু আমাদের প্রয়োজন মাঠ পর্যায়ে এটির পুর্নাঙ্গ বাস্তবায়ন।
কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলের মানুষের এই মানববন্ধন শুধু একটি কর্মসূচি নয়, বরং এটি একটি জীবনমরণ প্রশ্নের প্রতিধ্বনি। তারা লড়ছেন শুধু নদীর ভাঙনের বিরুদ্ধে নয়, লড়ছেন এক বৈশ্বিক অবিচারের বিরুদ্ধে যেখানে জলবায়ু পরিবর্তনের দায় তাদের নয়, কিন্তু ভোগান্তির ভার তাদের ঘাড়ে।এই কণ্ঠস্বর যেন শুধু বানিয়াপাড়া গ্রামে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং আন্তর্জাতিক জলবায়ু নীতিনির্ধারকদের কানে পৌঁছায় এমনটাই এখন সময়ের দাবি।
