চরের শিশুরা: স্বপ্নের আগে বেঁচে থাকার লড়াই

 

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের নদীবেষ্টিত চরগুলো যেন একেকটি ‘প্রান্তিকতার দ্বীপ’। সেখানে জীবন চলে নদীর খেয়ালে, মৌসুমী বন্যা আর ভাঙনের আশঙ্কায়। কুড়িগ্রাম জেলায় এমনই কয়েকটি চরে সম্প্রতি ঘুরে দেখা গেল—সবচেয়ে অবহেলিত ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে এখানকার শিশুরা।

তাদের জীবনজুড়ে রয়েছে দারিদ্র্য, স্বাস্থ্যঝুঁকি, শিক্ষার অভাব, অনিরাপদ আশ্রয় এবং মানসিক অবসাদ। চরবাসার ছেলেমেয়েরা যেন জন্ম থেকেই নানান বৈষম্যের শিকার। অথচ, তাদেরও স্বপ্ন আছে। আছে ভালোবাসা পাওয়ার, শেখার এবং সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষা।

চরের শিশুরা সাধারণত কোনো নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আসে না। ঠিকমতো টিকা পায় না, অপুষ্টি ও পানিবাহিত রোগে ভোগে বছরের পর বছর। চর এলাকায় পাকা রাস্তা নেই, হাসপাতালে পৌঁছাতে হয় নদী পেরিয়ে। ফলত, অনেক সময়েই সময়মতো চিকিৎসা পাওয়া সম্ভব হয় না। অপুষ্টি, ডায়রিয়া, চর্মরোগ এসব যেন এখানকার নিত্যসঙ্গী।

সমাধানের প্রস্তাবনা:

১/মোবাইল মেডিকেল টিম চালু করে সাপ্তাহিক সেবা

২/স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মী প্রশিক্ষণ দিয়ে চরে নিয়োগ

৩/শিশু ও মাতৃপুষ্টি প্রকল্পের সম্প্রসারণ

 

চরাঞ্চলের শিক্ষাব্যবস্থা খুবই সীমিত। স্কুলের সংখ্যা একেবারেই কম, অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নেই, আবার স্কুলে পৌঁছাতে হয় দুর্গম পথ পেরিয়ে। বিশেষ করে মেয়েশিশুদের ক্ষেত্রে বাল্যবিবাহ এবং গৃহকর্মে যুক্ত হওয়া খুবই সাধারণ ঘটনা। অপ্রতুল শিক্ষা সুযোগের কারণে এই শিশুরা ভবিষ্যতের সম্ভাবনা হারিয়ে ফেলছে আগেই।

সমাধানের প্রস্তাবনা:

১/চরভিত্তিক নৌকা-বিদ্যালয় বা ভ্রাম্যমাণ শিক্ষা কেন্দ্র

২/চর এলাকায় কর্মরত শিক্ষকদের বিশেষ প্রণোদনা

৩/মেয়েশিশুদের জন্য শিক্ষা সহায়তা ও সচেতনতা কার্যক্রম

প্রায়শই নদীভাঙনে বসতভিটা হারানো চরবাসী পরিবারগুলো টিকে থাকে জরাজীর্ণ ঘরে, যা শিশুর স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। চরগুলোতে এখনো বিদ্যুৎ পৌঁছেনি, নিরাপদ পানির উৎস কম, নেই স্যানিটেশন ব্যবস্থা। শিশুরা খালি পায়ে হাঁটে, গরমে জলন্ত বালুতে, বর্ষায় কাঁদা ও পানিতে সিক্ত হয়ে বেড়ে ওঠে।

সমাধানের প্রস্তাবনা:

১/টিউবওয়েল, পায়খানা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন

২/নদীভাঙন প্রতিরোধ ও টেকসই ঘর নির্মাণ

৩/খেলার মাঠ, পাঠাগার ও শিশু ক্লাব স্থাপন

৪/মানসিক বিকাশ ও সৃজনশীলতার সংকট

 

চরের শিশুরা বঞ্চিত হয় খেলাধুলা, বই পড়া, সৃজনশীলতা বিকাশের সুযোগ থেকে। তাদের শৈশব হয়ে ওঠে প্রাপ্তবয়স্কদের মতো চাপপূর্ণ ও বিষণ্ন। খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম এবং কিশোর সংগঠন গড়ে না উঠলে এই শিশুরা ভবিষ্যতে আত্মবিশ্বাস ও সক্ষমতা হারিয়ে ফেলবে।

 

সমাধানের প্রস্তাবনা:

১/চরাঞ্চলে শিশু-কাউন্সেলিং ও মনোসামাজিক সহায়তা কেন্দ্র

২/স্থানীয়ভাবে খেলাধুলা, চিত্রাঙ্কন, নাটক ও গান আয়োজন

৩/শিশু সংগঠন গঠন ও নেতৃত্ব বিকাশ কার্যক্রম

 

চরের শিশুরা আমাদের শহরের শিশুর মতোই স্বপ্ন দেখে। তারাও চায় বই হাতে স্কুলে যেতে, খেলতে, হাসতে, ভালোবাসতে। রাষ্ট্র ও সমাজের যৌথ দায়িত্ব হলো তাদের এই অধিকার নিশ্চিত করা। প্রয়োজন শুধু আন্তরিকতা ও কার্যকর উদ্যোগ। তাহলেই চরাঞ্চলের এই শিশুরাও একদিন দেশের সম্পদ হয়ে উঠবে।

তাদের প্রশ্নের জবাব এখন আমাদেরই দিতে হবে—

“আমরা কী চেয়েছিলাম?”

উত্তর: ভালোবাসা, শিক্ষা, আর সুস্থ জীবন।

 

লেখা: আতিকুর রহমান

স্বেচ্ছাসেবক ও স্থানীয় সংবাদকর্মী

ছবিঃ চর বেগুনি পাড়া, কালিগঞ্জ, নাগেশ্বরী, কুড়িগ্রাম

Share Button