কুড়িগ্রামে অপপ্রচারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান

জাফর আহমেদ কুড়িগ্রাম জেলা সংবাদদাতাঃ

কুড়িগ্রামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য, গুজব ও অপপ্রচার বিস্তারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে এক মতবিনিময় ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বক্তারা বলেন, পরিকল্পিত অপপ্রচার শুধু ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি করে না, বরং সামাজিক সম্প্রীতি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে। এ ধরনের অপতৎপরতার বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত সভায় জেলার রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, প্রশাসনের কর্মকর্তা, বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং গণমাধ্যমকর্মীরা অংশ নেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ। তিনি তাঁর বক্তব্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দায়িত্বশীল ব্যবহারের ওপর বিশেষ জোর দেন।
জেলা প্রশাসক বলেন, “বর্তমান সময়ে তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ প্রবাহের যেমন সুফল রয়েছে, তেমনি একটি স্বার্থান্বেষী মহল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করে বিভ্রান্তি ছড়ানোর অপচেষ্টা চালাচ্ছে। অনেক সময় যাচাই না করে তথ্য শেয়ার করার ফলে সমাজে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। অপপ্রচারকারীরা সমাজে বিভেদ সৃষ্টি ও অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করে, যা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।”
অপপ্রচার রোধে জেলা প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে অন্নপূর্ণা দেবনাথ আরও বলেন, “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেকোনো সংবেদনশীল তথ্য বা খবর ছড়ানোর আগে তার সত্যতা নিশ্চিত করা প্রত্যেকের নাগরিক দায়িত্ব। কোনো গুজব বা বিভ্রান্তিকর তথ্য চোখে পড়লে তা অবিলম্বে প্রশাসনকে জানানোর জন্য আমি সকলের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। সাইবার অপরাধ ও অপপ্রচারের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসন জিরো টলারেন্স নীতি বজায় রাখবে এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
সভায় আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বক্তব্য রাখেন জেলা পরিষদের প্রশাসক সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদ। তিনি বলেন, সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে অপপ্রচারকারীদের বিরুদ্ধে সম্মিলিত সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। মিথ্যা তথ্য ও গুজব ছড়ানোর সংস্কৃতিকে কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না।
আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য রাখেন কুড়িগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) কুদরত-এ-খুদা, সহকারী কমিশনার ফাহাদ বিন সালাউদ্দিন এবং জেলা শিক্ষা অফিসার শফিকুল ইসলাম।
রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের মধ্যে বক্তব্য রাখেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু, জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি নিজাম উদ্দিন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র সহ-সভাপতি অধ্যক্ষ নুর বখত এবং এনসিপির জেলা সভাপতি মুকুল মিয়া।
নেতৃবৃন্দ তাঁদের বক্তব্যে বলেন, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় উস্কানিমূলক অপপ্রচার সমাজে বিভাজন ও সংঘাত সৃষ্টি করে। এসব অপতৎপরতা বন্ধে রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন ও সাধারণ জনগণকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। তারা অপপ্রচারকারীদের সামাজিকভাবে প্রতিহত করার পাশাপাশি আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।
সভায় বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল বাতেন অপপ্রচারের বিরুদ্ধে যুবসমাজকে সচেতন করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, তরুণদের সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে, যাতে কোনো গুজব বা বিভ্রান্তিকর প্রচারণা সমাজে প্রভাব বিস্তার করতে না পারে।
গণমাধ্যমকর্মীদের পক্ষে বক্তব্য রাখেন কুড়িগ্রাম প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মাহফুজার রহমান খন্দকার, সিনিয়র সাংবাদিক আশরাফুল হক রুবেল, সাইয়েদ আহমেদ বাবু এবং সাংবাদিক রাশেদুল ইসলাম রাশেদ।
সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ বলেন, অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র হলো বস্তুনিষ্ঠ ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা। তারা গুজব ও বিভ্রান্তিকর তথ্য মোকাবিলায় আইনি ও কারিগরি নজরদারি জোরদারের পাশাপাশি তথ্য যাচাই ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানান।
সভায় বক্তারা একমত পোষণ করেন যে, শুধুমাত্র সরকারি উদ্যোগ বা আইন প্রয়োগের মাধ্যমে অপপ্রচার পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক সংগঠন এবং সমাজের প্রতিটি স্তরে সচেতনতা বৃদ্ধি ও সত্যভিত্তিক তথ্যচর্চার সংস্কৃতি গড়ে তুললেই অপপ্রচারের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ সম্ভব হবে।

Share Button