বিলুপ্ত হয়েছে প্রাচীনতম ঐতিহ্য কাঠের তৈরি খড়ম

নুরনবী মিয়া, ফুলবাড়ী(কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি:

প্রাচীনকাল থেকেই বাংলাদেশে খড়ম (কাঠের তৈরি পাদুকা) ব্যবহারের প্রচলন। কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলাতে আশির দশকেও অনেকে খড়ম ব্যবহার করতেন। ভারত উপমহাদেশের বিশিষ্ট অাউলিয়া হযরত শাহজালাল (র:)১৪শ শতকে বাংলাদেশের সিলেটে বসতি স্থাপন করেছিলেন। তার ব্যবহৃত খড়ম এখনো তার সমাধিস্থল সংলগ্ন স্থাপনায় সংরক্ষিত অাছে। সনাতন ধর্মেও খড়মের ব্যবহার অনেক প্রাচীন। তারা খড়মকে দেবতা ও শ্রদ্ধেয় সাধুসন্তদের পদচিহ্নের প্রতীক মনে করেন। সনাতন ধর্মের পাশাপাশি জৈনধর্মেও ভিক্ষাজীবি সন্ন্যাসী ও সাধুসন্তেরা খড়ম ব্যবহার করতেন। সনাতন ধর্মের মহাকাব্য রামায়ণে খড়মের একটি বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। এক সময় সমগ্র দেশের মানুষই ছিল খড়মের উপর নির্ভরশীল।
৭০ এর দশক পর্যন্ত খুবই জনপ্রিয় ছিল খরম। কালের বিবর্তন ও আধুনিকতার ছোঁয়ায় কাঠের তৈরি খড়ম এখন শুধুই স্মৃতি। একখন্ড কাঠ পায়ের মাপে কেটে নিয়ে এটি তৈরি করা হত। পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলি ও পাশের অাঙ্গুলি দিয়ে অাকড়ে ধরার জন্য সম্মুখভাগে একটি বর্তলাকার কাঠের গুটি বসানো হতো। এটি মূলত পায়ের নিরাপওার জন্য অাবিষ্কার হয়েছিল। কেবল নিরাপওাই নয়, ছিলো সাজ-সজ্জারও একটি অংশ।
এরপর যানবাহনের চাকায় ব্যবহৃত টায়ার ও টিউব কেটে তৈরি হয় এক ধরনের জুতা। যার নামকরণ করা হয় টায়ার জুতা। কালের বিবর্তনে টায়ার জুতাও বিলুপ্ত হয়ে বিভিন্ন মডেলের সেন্ডেলে বাজার সয়লাব হয়। খরম শিল্পের কারিগরদেরও আর খুঁজে পাওয়া যায় না। বিগত কয়েক বছর ধরে বার্মিস জুতায় দেশের নগর-মহানগর, শহর- এমনকি সব গ্রাম ছেঁয়ে গেছে। তাছাড়াও চামড়া , রেকসিন, প্লাস্টিক, কাপড়ের তৈরি জুতাও এখন মানুষের পায়ে পায়ে।
চন্দ্র-খানা গ্রামের বাসিন্দা সালমা বেগম(৮০) জানান, কিছুকাল আগেও খড়মের শব্দে গৃহস্থরা বুঝতে পারতেন তাদের বাড়িতে কেউ আসছেন। রুপসী গ্রাম-বাংলার পরিবারের সবাই খড়ম ব্যবহার করতেন। বাড়ীতে অাত্নীয়/কুটুম অাসলে একজোড়া খরম অার এক ঘটি পানি দিতেন হাত ও মুখ ধোয়ার জন্য। এই খড়ম পরে বিবাহ হত, খড়ম পায়ে দিয়েই নববধূ শশুর বাড়ীতে যেত।
বড়ভিটা এলাকার কাঠমিস্ত্রি শ্রী নিরমল চন্দ্র রায় জানান, কাঠ দিয়ে তৈরি খড়ম পরিবেশবান্ধব। তারপরও মানুষ এটিকে পরিহার করেছে। এক জোড়া খড়ম তৈরিতে বর্তমানকার বাজারে খরচ হবে ২০০-৩০০ টাকা। পক্ষান্তরে বার্মিসের এক জোড়া জুতা পাওয়া যায় মাত্র ৮০-১০০ টাকায়। দাম সাশ্রয়ী হওয়ায় সবাই বার্মিসের জুতাই ব্যবহার করেন।
শিক্ষক আব্দুল মজিদ বলেন, যুগের সাথে তাল মিলিয়ে আমাদেরও বার্মিস জুতা ব্যবহার করতে হচ্ছে। খড়ম পায়ে দিয়ে চলাফেরা করলে বেমানান মনে হয়। ইচ্ছা থাকলেও অার খড়ম ব্যবহার করি না। খড়ম পায়ে দিয়ে চলাফেরা করেন এমন মানুষ এখন নাই। ব্যবহারকারী না থাকায় কাঠের পাদুকা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। খড়ম শিল্পের সাথে জড়িত কারিগরও নাই।

Share Button