হাসপাতালের সংকট নয় : চলছে পদ বণ্টনের রাজনীতি

কুড়িগ্রাম জেলা প্রতিনিধি:

কুড়িগ্রামের ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল আজ নানা সংকটে জর্জরিত। চিকিৎসক সংকট, জনবল ঘাটতি, ওষুধের অভাব, বিকল অ্যাম্বুলেন্স, বেহাল লিফট ব্যবস্থা,সব মিলিয়ে জেলার লাখো মানুষের একমাত্র ভরসার এই হাসপাতাল যেন নিজেই চিকিৎসার অপেক্ষায়। অথচ এসব সমস্যার সমাধানে কার্যকর উদ্যোগের বদলে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটিতে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তির ঘটনা নতুন করে ক্ষোভ ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির তালিকায় কুড়িগ্রাম পৌর আওয়ামী লীগের ত্রাণ, দুর্যোগ ও সমাজকল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক মোঃ তাজুল ইসলামকে সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। গত ২ জুন স্বাক্ষরিত কমিটির ১৬ নম্বর সদস্য হিসেবে তার নাম প্রকাশ হওয়ার পর থেকেই স্থানীয় সচেতন মহল, ছাত্র-জনতা এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, যখন হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা ভেঙে পড়ার উপক্রম, তখন জনগণের প্রত্যাশা ছিল স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়ন, জবাবদিহিতা এবং সেবার মান বৃদ্ধির উদ্যোগ। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ কমিটিতেও রাজনৈতিক বিবেচনা প্রাধান্য পাচ্ছে।
কুড়িগ্রামবাসীর দীর্ঘদিনের অভিযোগ,হাসপাতালে প্রয়োজনীয় সংখ্যক চিকিৎসক নেই, গুরুত্বপূর্ণ বিভাগগুলোতে জনবল সংকট প্রকট, রোগীদের বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে বাধ্য হতে হয়। অ্যাম্বুলেন্স দীর্ঘদিন ধরে মেরামতের অভাবে অচল অবস্থায় পড়ে রয়েছে। কয়েকদিন আগেই হাসপাতালের লিফটে মানুষ আটকে পড়ার ঘটনা আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিল। এসব মৌলিক সমস্যা সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ না দেখে সাধারণ মানুষের হতাশা ক্রমেই বাড়ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “হাসপাতালে চিকিৎসক নেই, ওষুধ নেই, যন্ত্রপাতির সংকট; অথচ এসব নিয়ে কেউ মাথা ঘামাচ্ছে না। মানুষ চিকিৎসা পাবে কি না, সেটি বড় বিষয় হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এখন যেন সবচেয়ে বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে কে কোন কমিটিতে থাকবে।”
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ও সদস্য সচিব ডা. নূর নেওয়াজ আহমেদ জানিয়েছেন, কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত সভাপতির কার্যালয় থেকে এসেছে এবং এতে তার কোনো ভূমিকা নেই। কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন কুড়িগ্রাম-২ আসনের সংসদ সদস্য ড. আতিকুর রহমান মোজাহিদ।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, স্বাস্থ্যসেবার মতো সংবেদনশীল খাতে রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে দক্ষতা, সততা, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ও জনস্বার্থে কাজ করার মানসিকতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। অন্যথায় জনগণের আস্থা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
কুড়িগ্রামের মানুষ আজ কোনো রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব নয়, চায় কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা। তারা চায় হাসপাতালে পর্যাপ্ত চিকিৎসক, প্রয়োজনীয় ওষুধ, সচল অ্যাম্বুলেন্স, নিরাপদ অবকাঠামো এবং জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনা। কারণ অসুস্থ মানুষের কাছে রাজনৈতিক পরিচয় নয়, জীবন রক্ষার সেবাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
এখন প্রশ্ন একটাই,কুড়িগ্রামের হাসপাতালের জরুরি সংকটগুলো সমাধান হবে কবে? নাকি জনগণের দুর্ভোগের চেয়ে পদ বণ্টনের রাজনীতিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে?

Share Button