হু হু পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে তিস্তার পানি : কুড়িগ্রামে বন্যা আতঙ্ক

জাফর আহমেদ, কুড়িগ্রাম জেলা সংবাদদাতা:

টানা বর্ষণ আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কুড়িগ্রামে আবারও দ্রুত বাড়ছে তিস্তা নদীর পানি। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে পানির উচ্চতা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় তিস্তা তীরবর্তী চর ও দ্বীপচরের নিচু এলাকা প্লাবিত হতে শুরু করেছে। ফসলি জমি, বসতভিটা ও গ্রামীণ সড়কে পানি ঢুকে পড়ায় নদী তীরবর্তী হাজারো মানুষের মধ্যে নতুন করে বন্যা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

বুধবার (৮ জুলাই) সকালে কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, তিস্তা নদীর কাউনিয়া পয়েন্টে সকাল ৬টায় পানির উচ্চতা ছিল ২৮ দশমিক ৮২ মিটার। মাত্র তিন ঘণ্টার ব্যবধানে সকাল ৯টায় তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৮ দশমিক ৯৬ মিটারে। অর্থাৎ মাত্র তিন ঘণ্টায় পানি বেড়েছে ১৪ সেন্টিমিটার। বর্তমানে তিস্তার পানি বিপৎসীমার মাত্র ৩৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। একই সময়ে দুধকুমার নদীর পাটেশ্বরী পয়েন্টে পানি ১ সেন্টিমিটার এবং ধরলা নদীর তালুকসিমুলবাড়ী পয়েন্টে ২ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে কুড়িগ্রাম সেতু পয়েন্টে ধরলার পানি ১ সেন্টিমিটার কমেছে এবং ব্রহ্মপুত্রের চিলমারী পয়েন্টে পানির স্তর অপরিবর্তিত রয়েছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় চিলমারী উপজেলায় ১৫০ মিলিমিটার, পাটেশ্বরী এলাকায় ৫৪ মিলিমিটার এবং কুড়িগ্রাম সদরে ৫২ দশমিক ৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আবহাওয়ার এমন পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে নদ-নদীর পানি আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তিস্তা তীরবর্তী ঘড়িয়ালডাঙ্গা চরের বাসিন্দা বদিয়ত মিয়া বলেন, “পানি বাড়তে থাকায় নিচু এলাকার ফসলি জমি ও বসতভিটায় পানি ঢুকতে শুরু করেছে। এক রাতে এত দ্রুত পানি বাড়তে আগে দেখিনি। যেভাবে পানি বাড়ছে, তাতে আজ রাতেই অনেক এলাকা তলিয়ে যেতে পারে।”
জেলা চর উন্নয়ন কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাংবাদিক সাইয়েদ আহমেদ বাবু বলেন, “কুড়িগ্রাম ১৬টি নদ-নদীবেষ্টিত জেলা। একদিকে বন্যা, অন্যদিকে নদীভাঙন—এই দুই দুর্যোগে চরাঞ্চলের মানুষ বারবার সর্বস্ব হারাচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দ্রুত দাঁড়ানো এবং নদীভাঙন রোধে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি।”
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা বেনজির আহমেদ জানান, সম্ভাব্য বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ২৮৫ মেট্রিক টন জিআর চাল, ১ লাখ ৬২ হাজার টাকা এবং ৮০০ প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে আরও সহায়তা দেওয়া হবে।
এদিকে কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিবুল হাসান পরিস্থিতি নিয়ে সতর্ক করে বলেন, “উজানে ভারী বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলের প্রভাবে জেলার নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। আগামী কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তিস্তাসহ জেলার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নদীর পানি বিপৎসীমা স্পর্শ করতে পারে। তাই চরাঞ্চল ও নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদের কোনো ধরনের গুজবে কান না দিয়ে প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার প্রস্তুতি রাখতে হবে। পানি উন্নয়ন বোর্ড, জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা সার্বক্ষণিক মাঠে কাজ করছে। পরিস্থিতির অবনতি হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা তাৎক্ষণিক গ্রহণ করা হবে। মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তাই এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।”
নদীর পানি যেভাবে ঘণ্টায় ঘণ্টায় বাড়ছে, তাতে কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের উৎকণ্ঠা আরও গভীর হচ্ছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, উজানে বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে অল্প সময়ের মধ্যেই নতুন করে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তর ইতোমধ্যে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থাকলেও নদী তীরবর্তী মানুষকে আগাম প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

Share Button