জাফর আহমেদ, কুড়িগ্রাম জেলা সংবাদদাতা:
কয়েক দিনের টানা অতিবৃষ্টি আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কুড়িগ্রামের ওপর দিয়ে প্রবাহিত ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা ও দুধকুমার নদীর পানি একসময় বিপৎসীমার কাছাকাছি পৌঁছে যায়। এখন পানি কিছুটা কমতে শুরু করলেও নতুন করে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ নদীভাঙন। প্রতিদিন নদীর গর্ভে বিলীন হচ্ছে মানুষের স্বপ্ন, বসতভিটা, আবাদি জমি, গাছপালা এবং বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা জীবনসংগ্রামের ঠিকানা। অনিশ্চয়তার এই কঠিন সময়ে নদীপাড়ের মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে ক্ষয়ক্ষতি কমাতে দিন-রাত নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, জেলার আটটি উপজেলার অন্তত ৩৩টি পয়েন্টে নদীভাঙন স্পষ্টভাবে শনাক্ত হয়েছে। কুড়িগ্রাম সদর, রাজারহাট, উলিপুর, ফুলবাড়ী, নাগেশ্বরী, ভূরুঙ্গামারী, রৌমারী ও রাজিবপুর উপজেলায় ভাঙনের তীব্রতা সবচেয়ে বেশি। এর মধ্যে রৌমারী উপজেলার চর শৌলমারী ইউনিয়নের সুখেরবাতি এবং রাজিবপুর উপজেলার কোদালকাটি ইউনিয়ন বর্তমানে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
নদীর ভয়াল গ্রাস থেকে মানুষের ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি রক্ষায় জরুরি ভিত্তিতে প্রায় ৩ লাখ ৯৩ হাজার ৫০০টি ২৫০ কেজি ওজনের জিও ব্যাগের চাহিদা নিরূপণ করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। সুখেরবাতি এলাকার জন্য ৩৪ হাজার ৬০০টি এবং কোদালকাটি এলাকার জন্য ৩০ হাজার জিও ব্যাগের প্রয়োজন রয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া মাত্রই দ্রুততম সময়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় জিও ব্যাগ ডাম্পিং সম্পন্ন করা হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ইতোমধ্যে যেসব এলাকায় জিও ব্যাগ পৌঁছেছে, সেখানে জরুরি ভিত্তিতে ডাম্পিং কার্যক্রম চলমান রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মতে, কয়েকটি স্থানে এর ইতিবাচক প্রভাবও দেখা দিতে শুরু করেছে এবং নদীভাঙনের গতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে।
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার চর যাত্রাপুর এলাকার বাসিন্দা আব্দুল আজিজ বলেন, “নদীর ভয়াবহ ভাঙনের কারণে নির্ঘুম রাত কাটাতে হচ্ছে। কখন যে ভিটেমাটি নদীতে বিলীন হয়ে যায়, সেই আতঙ্কে আছি। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা এসে পরিস্থিতি পরিদর্শন করেছেন এবং দ্রুত জিও ব্যাগ ফেলার আশ্বাস দিয়েছেন। এখন সেই আশাতেই দিন পার করছি।”
রৌমারী উপজেলার বাসিন্দা সালাম বলেন, “নদীভাঙনের সঙ্গে প্রতিদিন লড়াই করে বেঁচে আছি। কর্মকর্তারা এসে ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ করেছেন। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হলে হয়তো এবার আমাদের বসতভিটা রক্ষা করা সম্ভব হবে।”
শুধু পরিদর্শনেই সীমাবদ্ধ নয়, স্থানীয় জনগণের সঙ্গে সমন্বয় করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিতকরণ, সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় স্থানে জরুরি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণে মাঠে রয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। প্রতিটি মুহূর্তে তারা নদীর গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করছেন, যাতে নতুন করে কোথাও ভাঙন শুরু হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিবুল হাসান বলেন, “বর্তমানে ৩০টি নদীভাঙন পয়েন্ট সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রয়েছে। এছাড়া আরও ১০টি সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাও নিবিড়ভাবে নজরদারিতে রাখা হয়েছে। যেখানে জরুরি ভিত্তিতে ভাঙন দেখা দিচ্ছে, সেখানে দ্রুত জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে। চাহিদা অনুযায়ী প্রতিটি স্থানে প্রায় ৭৫ মিটার করে সংরক্ষণ কাজ করা হবে। পাশাপাশি অতিরিক্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার এলাকায়ও প্রতিরক্ষা কাজের প্রয়োজন রয়েছে।”
তিনি আরও জানান, নদীভাঙনের স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে ব্রহ্মপুত্র নদীর বাম তীরে প্রায় ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণের একটি প্রকল্পের প্রস্তাব ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘমেয়াদে কুড়িগ্রামের নদীভাঙন নিয়ন্ত্রণে একটি যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এদিকে, নদীভাঙন প্রতিরোধে ইতোমধ্যে কুড়িগ্রাম সদর, রাজারহাট ও ফুলবাড়ী উপজেলাধীন ধরলা নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং বাম ও ডান তীর সংরক্ষণ শীর্ষক প্রায় ৫৯৫ কোটি টাকা ব্যয়ের একটি বৃহৎ প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়ন করেছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড। এই প্রকল্পের আওতায় নদীর দুই তীরে দীর্ঘ তীর সংরক্ষণ কাজ এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণের ফলে অনেক এলাকা আজ নিরাপদ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পই নদীতীরবর্তী মানুষের জীবন, বসতভিটা ও কৃষিজমি সুরক্ষার সবচেয়ে কার্যকর সমাধান।
জেলা জুড়ে নদীভাঙনের ঝুঁকি এখনও পুরোপুরি কাটেনি। তবে দুর্যোগের এই কঠিন সময়ে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরলস তৎপরতা মানুষের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। বিশেষ করে কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিবুল হাসানের নেতৃত্বে মাঠপর্যায়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দিন-রাত একাকার করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা পরিদর্শন, মানুষের খোঁজখবর নেওয়া, জরুরি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ভাঙনরোধে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁদের এই আন্তরিকতা ও দায়িত্বশীল ভূমিকা নদীপাড়ের মানুষের আস্থা আরও দৃঢ় করেছে।
নদী হয়তো এখনো তার ভয়ংকর রূপ পুরোপুরি গুটিয়ে নেয়নি, কিন্তু মানুষের পাশে প্রশাসনের সক্রিয় উপস্থিতি নতুন করে বাঁচার সাহস জোগাচ্ছে। নদীর সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকা কুড়িগ্রামের মানুষ এখন বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন—সমন্বিত উদ্যোগ, দ্রুত পদক্ষেপ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাই একদিন তাদের ভাঙনের আতঙ্ক থেকে মুক্তি এনে দেবে।
