রৌমারীতে বাড়ছে ছিন্নমূল মানুষের হাহাকার: নদীভাঙনে নিঃস্ব শতশত পরিবার 

জাফর আহমদ, কুড়িগ্রাম জেলা সংবাদদাতা:

কুড়িগ্রামের রৌমারী,একটি নাম, যা এখন শুধু একটি উপজেলার পরিচয় নয়; বরং এক চলমান মানবিক সংকটের প্রতিচ্ছবি। নদীভাঙন আর বন্যার নির্মম আঘাতে এখানে প্রতিদিনই বাড়ছে ছিন্নমূল মানুষের সংখ্যা, দীর্ঘ হচ্ছে হতাশা আর বেঁচে থাকার সংগ্রামের মিছিল।
ভৌগোলিক বাস্তবতায় রৌমারী এক ঝুঁকিপূর্ণ জনপদ। ব্রহ্মপুত্র, সোনাভরি, জিঞ্জিরাম, হলহলিয়া, কালো ও ধরণী নদী বেষ্টিত এই অঞ্চল প্রতি বর্ষায় পরিণত হয় দুর্যোগের ভয়াল মঞ্চে। নদীর গর্ভে বিলীন হচ্ছে ফসলি জমি, বসতভিটা, স্বপ্ন আর প্রজন্মের স্মৃতি। প্রতিটি ভাঙন যেন একটি পরিবারের অস্তিত্ব মুছে দেয়।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ভাষ্যও একই চিত্র তুলে ধরে। রৌমারী সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক বলেন, “ভিটেমাটি হারিয়ে মানুষ বাধ্য হয়ে বাঁধের ওপর, খাস জমিতে বা অন্যের জমিতে আশ্রয় নিচ্ছে। তাদের জীবনে নেই কোনো স্থিতি, নেই নিরাপত্তা।”
কুড়িগ্রাম জেলা চর উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু জানান, বর্তমান পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বন্দবেড় ইউনিয়নে ৮০০ থেকে ১০০০, রৌমারী সদর ইউনিয়নে ৪৫০ থেকে ৬০০, চর শৌলমারীতে ৭০০ থেকে ৯০০ এবং যাদুরচরসহ বিভিন্ন এলাকায় আরও ৫০০ থেকে ৭০০ পরিবার নদীভাঙন ও বন্যার শিকার। সব মিলিয়ে পুরো উপজেলায় প্রায় আড়াই থেকে সাড়ে তিন হাজার পরিবার এখন ছিন্নমূল।
তথ্য অনুযায়ী, এই বিপর্যস্ত মানুষের প্রায় ৮০ শতাংশই ব্রহ্মপুত্র নদের করাল গ্রাসে তাদের সবকিছু হারিয়েছে।
জেলা চর উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক সাইয়েদ আহমেদ বাবু বলেন, “বিকল্প কর্মসংস্থানের অভাব ও দীর্ঘস্থায়ী দারিদ্র্য মানুষকে বারবার বাস্তুচ্যুত করছে। চরাঞ্চলের মানুষ মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ায় তারা পুনর্বাসনের সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।”
সরেজমিনে দেখা যায়, এসব ছিন্নমূল মানুষের জীবনযাপন চরম মানবেতর। রাস্তার পাশে পলিথিন বা খড়ের ঝুপড়ি ঘরই তাদের একমাত্র আশ্রয়। নেই সুপেয় পানির নিশ্চয়তা, নেই স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থা। শিশুদের বড় একটি অংশ শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ছে। প্রতিটি দিন তাদের জন্য এক অনিশ্চিত সংগ্রাম।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকট আর সাময়িক কোনো সমস্যা নয়; এটি এখন দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও মানবিক চ্যালেঞ্জ। তারা নদীভাঙন রোধে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ, আশ্রয়ণ প্রকল্পে ভূমিহীনদের অগ্রাধিকার, ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং চরাঞ্চলে ভ্রাম্যমাণ শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন।
রৌমারীর মানুষ আজ শুধু সহানুভূতি নয়,চায় টেকসই সমাধান। দ্রুত ও কার্যকর পুনর্বাসন পরিকল্পনা না হলে, এই বিশাল জনগোষ্ঠী একসময় চরম দারিদ্র্য, ভিক্ষাবৃত্তি ও সামাজিক অবহেলার অন্ধকারে হারিয়ে যাবে।
নদীভাঙনের প্রতিটি ঢেউ যেন একটি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছে—আর কতদিন এভাবে ভেসে যাবে মানুষের জীবন?

Share Button