হাফিজুর রহমান হৃদয়:
কুড়িগ্রামের নাগেশ^রীতে গরুর ল্যাম্পি স্কিন ডিজিজ বা এলএসডি নামের এক ভাইরাসজনিত রোগের সংক্রমণ দেখা দিয়েছে। প্রতিনিয়ত নতুন করে আক্রান্ত হচ্ছে উপজেলার প্রতিটি গ্রামের হাজার হাজার গরু-বাছুর। প্রথমে জ্বর জ্বর ভাব, পরে গোটা গোটা হয়ে ক্ষতের সৃষ্টি হচ্ছে গরুর শরিরে। এরপর খসে খসে পরছে আক্রান্ত স্থানের চামড়া ও মাংসপিন্ড। সঠিক চিকিৎসার অভাবে এতে মারাও যাচ্ছে কৃষকদের স্বপ্নের সম্পদ। গরুর চামড়ার ক্ষতিকর ভাইরাস রোগের এমন আক্রমণ নিয়ে খামারি ও কৃষক পর্যায়ে দুশ্চিন্তা দেখা দিয়েছে। আশঙ্কা করছেন ব্যাপক লোকসানের। দিশাহারা কৃষকদের অভিযোগ বারবার প্রাণি সম্পদ অফিসে যোগাযোগ করেও দেখা মেলে না কর্মকর্তা কর্মচারীদের।
খামারি ও সংশ্লিষ্টরা জানান, হঠাৎ গরুর গা গরম হয়ে জ্বর ওঠে। শরীরজুড়ে ছোট ছোট মাংসপিন্ডের মতো ফুলে উঠছে। অনেকটা আঁচিলের মতো। পা, ঘাড়, মাথায় এসব বেশি উঠছে। চামড়া উঠে ক্ষতে পরিণত হচ্ছে। গরু এ সময় খাওয়া ছেড়ে দিচ্ছে। সব ধরনের গরুই আক্রান্ত হচ্ছে এই রোগে। বেশি আক্রান্ত হচ্ছে বাছুর।
চিকিৎসকদের মতে, আক্রান্ত গবাদি পশুর চোখ দিয়ে পানি ঝরে চোখ অন্ধ হয়েও যেতে পারে। ষাঁড় গরুর ক্ষেত্রে ইনফার্টিলিটি এবং গর্ভবতী প্রাণিতে গর্ভপাত ঘটে। ক্ষুরা রোগের চেয়েও বেশি ভয়ঙ্কর এ রোগটি সাধারণত বর্ষার শেষে, শরতের শুরুতে বা বসন্তে মশা-মাছির বিস্তারের সময় ব্যাপক আকারে দেখা দেয়। মশা-মাছির এবং খাবারের মাধ্যমে এক গরু থেকে অন্য গরুতে ভাইরাসজনিত এ রোগ ছড়ায়। ভ্যাক্সিন দিয়ে আক্রান্ত থেকে রক্ষা এবং আক্রান্ত হওয়ার পর আক্রান্ত গরু আলাদা ও মশারির ভেতর রাখা জরুরি। এ রোগে আক্রান্ত গরু নিয়ে প্রতিদিনই উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও ভেটেরিনারি হাসপাতালে কৃষকরা ভিড় করছেন। সঠিক পরামর্শ ও চিকিৎসার মাধ্যমে সেরেও উঠছে অনেক গরু।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় উপজেলার সন্তোষপুর ইউনিয়নের তালেবেরহাট এলাকায় ল্যাম্পি স্কিন ডিজিজে আক্রান্ত হয়েছে অধিকাংশ বাড়ির গরু। এছাড়াও ওই ইউনিয়নের শিয়ালকান্দা, রায়গঞ্জের সাপখাওয়া, মোল্লারভিটা, মিনাবাজার, বড়বাড়ী, পৌরসভার মধুরহাইল্যা, বলদিটারী, সাঞ্জুয়ারভিটা, বানিয়াটারীসহ উপজেলার প্রায় প্রতিটি গ্রামেই প্রকট আকার ধারণ করেছে এই রোগ। সন্তোষপুর ইউনিয়নের তালেবেরহাট গ্রামের কৃষক ইসমাইল হোসেন জানান তার খামারে ১২টি গরু রয়েছে। মাস খানেক ধরে খামারের ৫টি গরু ল্যাম্পি স্কিন ডিজিজে আক্রান্ত হয়। এর মধ্যে দুটি গরু সুস্থ হলেও মারা গেছে আরও ২টি গরু আরও একটি গরুর অবস্থা আসঙ্কাজনক। একই এলাকার আব্দুল মজিদ জানান তার খামারে ৫টি গরুর মধ্যে তিনটি গরু আক্রান্ত হয়। প্রাণি সম্পদ দপ্তরে খবর দিয়ে কোনো সাড়া না পেয়ে পল্লী চিকিৎসকের সরণাপন্ন হন তিনি। পরে একটি গরু সুস্থ হলেও মারা যায় আরেকটি। তবে আরও একটি গরু আক্রান্ত অবস্থায় আছে। বাকী গরুগুলো আক্রান্ত হওয়ার আসঙ্কা করছেন তিনি। এভাবে ওই এলাকার অন্ততঃ ১৫টি গরু মারা গেছে বলেও জানান অনেকে। এদিকে রায়গঞ্জ ইউনিয়নের মোল্লারভিটা এলাকার হাবিবুর রহমান জানায় তার গরু ল্যাম্পি স্কিন ডিজিজে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘদিন চিকিৎসার পর ভালো না হয়ে অবশেষে মারা গেছে। তিনি আরও জানান, কৃষকদের আয়ের অন্যতম উৎস পশু পাখি পালন। আর এভাবে কষ্টের সম্পদ নষ্ট হলে খুব ক্ষতির মুখে পড়েন তারা। এছাড়াও পৌরসভার বলদিটারী, সাঞ্জুয়ারভিটা, বানিয়াটারীসহ উপজেলায় প্রায় শতাধিক গরু মারা গেছে বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছেন। অপরদিকে উপজেলা প্রাণি সম্পদ দপ্তরের দাবি এ রোগে কোনো গরু মারা যাওয়ার খবর নেই তাদের কাছে।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এ উপজেলায় মোট ১ লাখ ৪৯ হাজার ১৩৯টি গবাদিপশু রয়েছে।
উপজেলা প্রাণি সম্পদ সম্প্রসারণ কর্মকর্তা কোকিল চন্দ্র বিশ^াস বলেন, লাম্পি স্কিন ডিজিজ একটি ভাইরাসজনিত রোগ। এ রোগে আক্রান্ত গরু থেকে অন্য গরুতে ছড়িয়ে পড়ছে। মশা ও মাছি এ ভাইরাসের প্রধান বাহক এছাড়াও কীট-পতঙ্গের মাধ্যমেও ভাইরাসটি ছড়াতে পারে। আক্রান্ত গরুর লালা গরুর খাবারের মাধ্যমে এবং খামার পরিচর্যাকারী ব্যাক্তির কাপড়ের মাধ্যমে এক গরু থেকে অন্য গরুতে ছড়াতে পারে। তাই গ্রামে গ্রামে ক্যাম্পেইন করে জন সচেতনতা বাড়ানো হচ্ছে এবং রোগ প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে।
