আতিকুর রহমানের ফিচার “চরপাড়ার আলো”

চরপাড়ার আলো

আতিকুর রহমান 

‎উত্তরবঙ্গের কুড়িগ্রাম জেলা। চারদিকে নদীর বেষ্টনী ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা, দুধকুমার, গঙ্গাধর আর ছোট-বড় অসংখ্য নদী। এ নদীগুলো যেমন মানুষের জীবনের আশীর্বাদ, তেমনি ভয়ঙ্কর অভিশাপও। প্রতি বছর বর্ষায় নদী ভাঙন আর বন্যা গ্রাস করে শত শত ঘরবাড়ি, জমি আর ফসল।
‎সরকারি হিসাবে (পানি উন্নয়ন বোর্ড, ২০২৩) কেবল কুড়িগ্রামেই প্রায় এক লাখ মানুষ প্রতি বছর নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চরাঞ্চলে প্রায় ৬৫% পরিবার দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। স্কুলে ভর্তি হার বাড়লেও চরাঞ্চলের শিশুদের মধ্যে প্রায় ৪০% নিয়মিত স্কুলে যেতে পারে না কারণ স্কুলে পৌঁছাতে দীর্ঘ নদীপথ পাড়ি দিতে হয়, আবার বর্ষায় সেই পথই থাকে ডুবে। এই বাস্তবতায় জন্ম নেয় চরপাড়ার শিশুদের গল্প।
‎চরনদীর ধারে থাকে বারো বছরের মমিন। বাবা মারা পর সংসারের ভার মায়ের কাঁধে। প্রতিদিন গরু চরানো আর ক্ষেতের কাজে মাকে সাহায্য করাই তার নিয়ম। তবু মমিনের চোখে থাকে স্কুলে যাওয়ার স্বপ্ন।
‎দূরে দেখে শহরের বাচ্চারা বই-খাতা হাতে স্কুলে যাচ্ছে। মমিন ভাবছে, ‘আমিও যদি একদিন পড়তে পারতাম!’
‎কিন্তু চরে স্কুল নেই। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় যেটা আছে, সেটা পার হতে হয় প্রায় তিন কিলোমিটার নদীপথ। বর্ষায় নৌকা ছাড়া যাওয়া যায় না। এজন্যই চরাঞ্চলে শিশুদের শিক্ষাবঞ্চিত হওয়ার হার দেশের অন্যান্য এলাকার তুলনায় দ্বিগুণ।
‎একদিন গ্রামে আসে কয়েকজন তরুণ তাদের হাতে বই, খাতা আর কিছু শিক্ষাসামগ্রী। তারা জানাল, সরকারের ‘মৌলিক শিক্ষা প্রকল্প’ এবং স্থানীয় এনজিও মিলিয়ে একটি পরীক্ষামূলক উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। লক্ষ্য চরাঞ্চলের শিশুদের জন্য অস্থায়ী কমিউনিটি স্কুল গড়ে তোলা।
‎গ্রামের মানুষ প্রথমে বিশ্বাস করতে পারেনি। চরে আবার স্কুল হবে নাকি? নদী তো ভেঙে সব নিয়ে যাবে! এমন সন্দেহ ছিল সবার মনে।
‎তবু শেষমেষ মসজিদের পাশে বাঁশ আর টিন দিয়ে তৈরি হলো ছোট্ট স্কুলঘর। মাটিতে মাদুর, পাশে ব্ল্যাকবোর্ড। স্কুলের নাম রাখা হলো চরশিশু প্রাথমিক শিক্ষাকেন্দ্র।
‎মমিন প্রথম দিন যখন খাতা-কলম হাতে পেল, তার চোখে যেন পুরো আকাশ ভেসে উঠল। মা কেঁদে বললেন, বাবা, লেখাপড়াই তোমার জীবন বদলাবে।
‎স্কুলে গিয়ে মমিনের মতো অনেক শিশু প্রথমবার অক্ষর চিনল। তারা অঙ্কে যোগ-বিয়োগ শিখল, বাংলায় কবিতা পড়ল, ইংরেজিতে নাম লিখতে পারল। শিক্ষক বললেন, শিক্ষা শুধু চাকরি পাওয়ার জন্য নয়, এটা মানুষ হওয়ার জন্যও দরকার।
‎সরকারি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের (DPE, ২০২২) তথ্যমতে কুড়িগ্রামে বর্তমানে প্রায় ৪,২০০টি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। তবে চরাঞ্চলের অন্তত ৩০% শিশু এখনও বিদ্যালয়ের বাইরে। এজন্য বিকল্প শিক্ষা কার্যক্রম যেমন শিশু কল্যাণ ট্রাস্ট স্কুল, এনজিও স্কুল, অস্থায়ী শিক্ষা কেন্দ্র খুবই কার্যকর হয়ে উঠছে।
‎তবে পথ সহজ নয়। বর্ষায় যখন বন্যা আসে, তখন স্কুলঘরে হাঁটু পানি ঢুকে যায়। বই-খাতা ভিজে যায়, শিক্ষকরা অনেক সময় নৌকা চালিয়ে আসতে পারেন না। তবু শিশুরা হাল ছাড়ে না। মমিনও প্রতিদিন গরু চরানো শেষে দৌড়ে আসে স্কুলে।
‎তার প্রিয় বিষয় ভূগোল। একদিন ক্লাসে সে বলে ফেলল, ‘স্যার, আমি বড় হয়ে নদীভাঙন ঠেকানোর কাজ করব।’
‎শিক্ষক অবাক হয়ে তাকালেন। তারপর ধীরে বললেন, ‘এই স্বপ্নই একদিন তোমাদের জীবন বদলাবে, মমিন।’
‎এখন শুধু মমিন নয়, তার মতো শত শত বাচ্চা চরের স্কুলে পড়ছে। মেয়েরা পড়াশোনা শিখে বাল্যবিয়ে এড়াচ্ছে। ছেলেরা কৃষিকাজের ফাঁকে অক্ষর চিনে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করছে।
‎সরকারও এ উদ্যোগকে সম্প্রসারণের চেষ্টা করছে। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এ বলা হয়েছে প্রতিটি শিশুর জন্য অন্তত অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষা নিশ্চিত করা হবে। এর আলোকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় চরাঞ্চল, হাওর-বাঁওড় ও দুর্গম এলাকায় বিশেষ শিক্ষা প্রকল্প হাতে নিয়েছে।
‎মমিন এখন সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। তার স্বপ্ন একদিন সে হবে একজন শিক্ষক। তার বন্ধু সালমা চায় ডাক্তার হতে, আরেকজন বন্ধু আজাদ চায় পুলিশ হতে।
‎তাদের চোখে আজ নতুন স্বপ্ন জেগেছে। চরাঞ্চলের যে মাটিতে কেবল নদীভাঙনের কান্না শোনা যেত, সেই মাটিতে এখন ভেসে আসছে শিশুর হাসি আর খাতা-কলমের শব্দ। চরের জীবন কঠিন, নদীভাঙন নির্মম। কিন্তু শিক্ষা হলো সেই একমাত্র আলো, যা অন্ধকার ভেদ করে ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে। চরপাড়ার মানুষ বিশ্বাস করতে শিখেছে- ‘শিক্ষাই বদলের হাতিয়ার।’
‎লেখক-ছাত্র ও সংবাদকর্মী
‎ফোন:০১৭৩৫০৩৯৪৬৫
Share Button