বানত বাড়ি ভিটা সউগ ভাসি গেইছে মোর ঈদ নাই বাহে

বানত (বন্যায়) সব ভাসি গেছে। বাড়ি-ভিটা নাই মোর। এক মাস ধরে মানষের জমিত আছি। দুই বেটিক (মেয়ে) নিয়া খুব অভাবত আছং, হামার ঈদ নাই বাহে।’ কথাগুলো বলছিলেন চল্লিশ বছর বয়সী লাইলি বেগম।

দুই কন্যা সন্তানকে নিয়ে তিনি এখন অন্যের জমিতে পলিথিনের ঝুপড়ি বেঁধে বসবাস করছেন। স্বামীর সাথে তার ডিভোর্স হয়েছে বছর তিনেক হলো। তাই স্বামীর নাম বলতে চাইছিলেন না তিনি। জোটেনি স্বামী পরিত্যক্ত ভাতাও।

কান্না জড়িত কণ্ঠে তিনি আরও বলেন, ‘দুই বেটিক কষ্ট করি পড়বারছি (পড়াচ্ছি), এবারের বানত হামার সোগ ঘর ভাঙি নিয়া গেছে। খায়া না খায়া হামার দিন যাবাইছে, কাইও এল্যা (কেউ এসে) এক মুঠো চাউল দেয় নাই।’

মোছা. লাইলি বেগম (৩৮) কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারী উপজেলার দুধকুমার নদের তীরের ঢাউয়ারকুটি চরের বাসিন্দা। দীর্ঘ দিন ধরে এই চরে বসাবাস করলেও কখনো বড় ধরনের ক্ষতি হয়নি বলেও জানান তিনি। এবারের বন্যায় তার বসতভিটা-বাড়ি-ঘর সবকিছু দুধকুমার নদের গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। খোলা আকাশের নিচে অন্যের জমিতে কলেজ পড়ুয়া দুই মেয়েকে নিয়ে বসবাস করছেন।
সরেজমিনে দুধকুমার পাড়ে গিয়ে দেখা যায়, পানি কমায় নিজের ভিটায় এসে খড়-কুটো কুড়াচ্ছেন তিনি। প্রথমে কথা বলতে ও ছবি তুলতে রাজি না হলেও, পরে রাজি হলেন। কারণ, তিনি আশা করেছেন এতে যদি তার কিছুটা উপকার হয়।

লাইলি বেগমের দুই কন্যা। বড় মেয়ে শাহানা পড়াশোনা করছেন নাগেশ্বরী কলেজে ডিগ্রি ফাইনাল ইয়ারে ও ছোট মেয়ে মৌসুমী পড়ছেন রায়গঞ্জ কলেজে ডিগ্রী ১ম বর্ষে। অন্যের বাসায় কাজ করে ও হাস-মুরগী, ছাগল পালন করে মেয়ে দুইজনকে কষ্ট করে মানুষ করেছেন তিনি। এখন বাড়ি-ঘর হারিয়ে অনেকটা বিপর্যস্ত অবস্থায় এ পরিবারটি।

লাইলি বেগমের ছোট মেয়েকে দুপুরে দেখা যায় পাশের একটি ক্ষেত থেকে পাট পাতা তুলতে। কথা হলে তিনি জানান, দুপুরের খাবারে পাটশাক ভাজি করার কাজে লাগবে এই পাট পাতা।

লাইলি বেগমের প্রতিবেশী আব্দুল মান্নান বলেন, ‘আমাদের এই চরের গ্রামে ৮০-১০০টি পরিবার ছিল, সবার বাড়ি-ভিটা দুধকুমার নদে বিলীন হয়ে গেছ। এখন পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারিভাবে কোনো সহযোগিতা পাননি তারা।’

জানা যায়, তার তিনটি ঘর ছিল। ঘরের কিছু হাড়ি-পাতিল ও মাচান ছাড়া কিছুই রক্ষা করতে পারেননি তিনি। আকস্মিকভাবে নদের পানি তার ভিটে বাড়িতে ঢুকে পড়ে। লাইলি বেগমের মতো এই চরে আরও বাসিন্দা রয়েছেন, যারা এখন ভিটে-বাড়ি হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

Share Button