শুরুতেই কবি শঙ্খ ঘোষের সেই বিখ্যাত উচ্চারণই মনে আসে কবি হাসান হাফিজ ও তাঁর কবিতার কথা ভাবতে গিয়ে। ‘প্রতিটি মুহূর্তে তুমি কবি’–এই শঙ্খবাচনের অন্বিষ্ট ও অনুষঙ্গ আলাদা। তবু হাসান হাফিজের দীর্ঘ কবিজীবন ও অজস্র ধারায় উৎসারিত কবিতার পরে কবিতা নিয়ে ভাবছি যখন, অবধারিতভাবেই মনের অতল থেকে উঠে এলো ওই প্রাজ্ঞোক্তি। অতিপ্রজ তিনি; জাগ্রত মুহূর্তগুলোকে নিংড়ে নিতে নিতে এদের দিয়েছেন কবিতার পদবি। কবিতা তাঁর কাছে বিশিষ্ট অর্থে সাংবাদিকতা–ব্যক্তিসত্তাকে সমষ্টিসত্তার সঙ্গে মেলাতে মেলাতে সময়ের প্রকৃত চিহ্নায়ক খুঁজে নিতে তৎপর থাকেন তিনি। সব ক্ষেত্রে তিনি সফল নন হয়তো; কিন্তু এ কথা তো স্বীকার করে নিতেই হয় যে হাসান হাফিজ অদ্বিতীয় সময়প্রহরী। প্রেম ও দ্রোহ, স্বপ্ন ও যুদ্ধ, স্বপ্নভঙ্গজনিত দহন এবং দহনকে মেনে নিয়েই যাত্রার নিরবচ্ছিন্নতা : ইতিহাসের এই বহুকৌণিক ও উচ্চাবচ প্রয়াণকে যেন কবিতার সংরূপে ধরে রেখেছেন তিনি। সমসাময়িক অন্য সব কবিকে ঠিক এখানেই ছাড়িয়ে গিয়ে স্বতন্ত্র মর্যাদায় দীপ্যমান হয়ে উঠেছেন কবি হাসান হাফিজ।
সত্তরের দশকে আধুনিক বাংলা কবিতাকে যাঁরা যৌবন দিয়েছেন, তাঁদের অন্যতম প্রধান কবিপুরুষ হাসান হাফিজ। তিনি মূলত প্রেম ও দ্রোহের কবি। রোমান্টিক স্বভাবের কবি হাসান হাফিজের রোমান্টিসিজম কেবল প্রেম ও প্রকৃতি নিয়ে নয়, তাঁর রোমান্টিকতা জীবন ও পরিপার্শ্ব নিয়ে, রোমান্টিকতা তাঁর দৃষ্টি নিয়েও। আর তাই প্রেম ও দ্রোহ কবি হাসান হাফিজের কবিতায় বারবার ঘুরেফিরে আসে। তাঁর কবিতা থেকেই এর সাক্ষ্য গ্রহণ করা যাক–
১. ‘তোমার টাঙ্গাইল শাড়ির জমিনে
ধু ধু ধানক্ষেত রাতপাখিদের ওড়াউড়ি
.
তোমার টাঙ্গাইল শাড়ির পাড়ে
ফুলের মত ফুটে আছে না পাওয়ারা।’
[কবিতা : টালমাটাল মানচিত্র]
২. ‘কতোদিন পরে দেখা
অনামিকা থেকে তুমি
খুলে ফেললে আকিকের অঙ্গুরীয়
.
আমি একবার ছুঁতে চাইছি–
তুমি চুম্বনেরই অধিকার দিয়ে দিলে
.
তারপর নিচু স্বরে তুমি বললে–চলি
আমাদের ব্যবধান ও দূরত্ব এবার
পরিষ্কার বোঝা গেল।’
[কবিতা : পরস্ত্রী]
৩. ‘পাহাড় ও নির্জনতা
আর দূর সমুদ্রের নোনা জলরাশি
মনে হয় আত্মীয় আপন
যতোটা না তুমি…’
[কবিতা : নির্জন অহংকার]
৪. ‘দিনগুলি যায় নানা রঙের
স্রোতের মতোই যায়,
কোনখানে এর শেষ জানি না
পুষ্পে না কাঁটায়…’
[কবিতা : দিনগুলি যায়]
৫. ‘অন্তহীন বিরহ-বিষাদ আমি চাই,
কেননা তখনই তোমার প্রেমের স্বাদ
ভালো করে পাই।’
[কবিতা : অনন্ত বিষাদ চাই]
৬. ‘আমাকে খুন করার জন্য
তোমার একজোড়া চোখই যথেষ্ট
আমি খুন হতে চাই…’
[কবিতা : কয়েক চ‚র্ণ]
৭. ‘নারী :
আরো একটু পুরুষ যদি হতে
সংহত আবেগে ক্ষোভে চেপে রাখতে
মর্মদন, অপূর্ণতার ব্যাপ্ত দাবি
আরও একটু পুরুষ যদি হতে…’
[কবিতা : নারী-পুরুষ]
কেবল পাপেই পূর্ণ ঘড়া
পুণ্য শীতল জলের খোঁজে
এই যে আমি প্রেমের মড়া’
[কবিতা : প্রেমের মড়া]
৯. ‘কাঁটা তুলতে গিয়ে কেন ফুল তুলে ফেলি
ফুলের আঘাতে আছে অমৃতের বিষণ্নতা
সারা রাত ঘুম কেড়ে নেয়’
[কবিতা : কাঁটা ফুল আস্থা ভুল]
১০. ‘পৃথিবীর একমাত্র দাহ্য বস্তু
আমার গরিব হৃদয়
ভালোবাসা, বারুদের ছোঁয়া পেলে
জ্বলে ওঠে দাউ দাউ…’
[কবিতা : একলা জ্বলা]
কবি হাসান হাফিজ কেবল রোমান্টিকতার জগতে আশ্রয় গ্রহণ করে বা যৌবনের বেদনার গানে অথবা রোমান্টিক প্রেমের তীব্র আকাঙ্ক্ষার জগতে নিজেকে আবদ্ধ রাখতে চাননি। কবির বিদ্রোহী কবিতাগুলো যেন বলে ওঠে, ‘হে প্রাচীন দণ্ডবায়স, এই নষ্ট উপত্যকা আজ ত্রাসের নগর। আদি এই বদ্বীপে এখন ফ্যাসিস্ট আর চোক্তারদের হেব্বি দোস্তি। এবার কিন্তু চাকতির ঘর খুলে যাবে।’ যেমন–২০২৫ সালের বইমেলায় প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘জয়গাথা জুলাই বিপ্লব’-এর ‘জয়গাথা জুলাই বিপ্লব’ কবিতায় ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের কুশাসনকে ইঙ্গিত করে বলেছেন–
প্রতিশোধ ঠিকই নেয় নিরীহ প্রকৃতি
এই সত্য ভুলে ছিল হীনম্মন্য স্বৈরাচার
ধন্য ধন্য তারুণ্যের সর্বপ্লাবী অনন্ত উদ্ভাস…’
বহু আগে তাঁর ‘জনতার জয়’ কবিতায় যেমন বলেছিলাম–
‘তাহলে পরাস্ত মৃত্যু, জয়তু জীবন
অগ্নিস্পৃষ্ট মানুষেরা
তছনছ করেছে কুটিল জাল, ষড়যন্ত্র
অশুভ মেঘের কৃষ্ণ আচ্ছাদন
আমার যখন শুরুর দিকের যৌবন, ঠিক তখনই তাঁকে পড়া শুরু করেছিলাম। কবিতা পড়ার অভ্যাস আর নেশা, দুই-ই তখন তৈরি হচ্ছে আস্তে আস্তে। সেই কাঁচা সময়টাতে তাঁর কবিতা, সযত্নে লালিত বহু ধারণাই মিহি টোকায় ভেঙে দিয়েছিল।
কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছার মতো বিশ্লেষণ কবিতার ক্ষেত্রে আদৌ সম্ভব কি না, সে বিষয়ে আমি অন্তত আজও সন্দিহান। কিন্তু তার বাইরে যে বড় পরিধিতে আমরা একজন কবিকে পড়ে থাকি, সেখানে দাঁড়িয়ে নির্দ্বিধায় বলতে পারি, ঠিক ওই রকম কবিতা আমরা তাঁর আগে কারো থেকে খুব বেশি পাইনি। পরে আলাদা করে তাঁর লেখার আঙ্গিক, বিষয়, শৈলী বা দৃশ্যকল্পের ব্যবহার নিয়ে ভেবেছি মনে মনেই, কিন্তু এসবের অনেক আগেই তিনি আমাদের চেতনার টেবিলে চতুর মুদ্রাটি নামিয়ে রেখেছিলেন নিঃশব্দে।
বিক্ষিপ্তভাবে পড়েছি এর আগে, সমূহে ও গোগ্রাসে পড়া হয়নি। অতি সম্প্রতি আমার হাতে এসেছিল অনন্যা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত কবির ‘কবিতাসমগ্র’। সেই শুরু হলো পড়া। সারা দিন কাজের শেষে ভরা সন্ধ্যায় সেই ঘোর মাথায় নিয়ে একের পর এক আউড়ে গেলাম কবি হাসান হাফিজের কবিতা। সারা দিনের ঘোর নেশায় পরিণত হতো। পরে মনে হয়েছে, আরো তো প্রিয় কবি ছিলেন আমার কাছে। রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, সৈয়দ শামসুল হক, রফিক আজাদ, আবুল হাসান, আসাদ চৌধুরী, নির্মলেন্দু গুণ, হেলাল হাফিজ তো আমাদের কম লালন করেননি। তাঁদের সঙ্গে অসীম সাহা, মহাদেব সাহা আছেন। তাঁদের পূর্বসূরিদের কথা না হয় ছেড়েই দিলাম। তাহলে কেন আলাদা করে কবি হাসান হাফিজের কবিতা আমাকে টানছিল সেই সন্ধেগুলোয়? সে কি কেবল নতুনকে আবিষ্কারের নির্মল আনন্দ, না তার চেয়েও বেশি কিছু? এখন বুঝতে পারি, সেলুলয়েডের মাধ্যমে ভাষার ও প্রকাশভঙ্গির যে নতুন পৃথিবী উচ্চারিত হচ্ছিল আমাদের সামনে, কবি হাসান হাফিজের কবিতা সেই ভাষার অংশীদারি বহন করছিল। যেন বাংলা কবিতার চিরাচরিত চিহ্ন স্বীকার করেও বন্দর থেকে ছেড়ে যাওয়া বহুদূরের জাহাজের মতো দেখাচ্ছিল তাঁর কবিতাদের। এই নিঃশব্দ উড়ান আমাদের টেনেছিল।
তাঁর সমসাময়িক কবিদের কথা বারবার এসে পড়ছে এ কারণেই যে, সত্তরের দশকে বাংলা কবিতা আমূল পাল্টে গিয়েছিল। ভাষা থেকে বিষয়, দর্শন থেকে প্রকাশ, সবটাই। সময়ের একটা নিজস্ব দাপট থাকে, সত্তরের দশকের কবিরা সেই দাপটের মান রেখেছিলেন। একদিকে আবিদ আজাদের স্থিতধী, প্রতিশ্রুতিময় প্রজ্ঞাবান কাব্য, পাশাপাশি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর অস্তিত্ববাদী তাগিদ ও তুমুল প্রেম। অন্যদিকে ময়ূখ চৌধুরীর ঘোরগ্রস্ত বিষাদময় বোধ, পাশাপাশি রবীন্দ্র গোপের দিব্যোন্মাদ প্রতিভাসঞ্জাত নিখাদ যাপনের পদ্যগুচ্ছ। এই এত কিছুর মধ্য দিয়ে কবি হাসান হাফিজের কবিতা বেরিয়ে এলো একেবারে আলাদা একটা পথ ধরে। তাঁর কবিতা হয়ে উঠল আলো-ঝলমল রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া, রহস্যের চাদরে গা ঢাকা দেওয়া এক চরিত্র, যার হাতে লুকানো রয়েছে ছুরি। তাঁর কবিতা হয়ে উঠল দৈনন্দিনতার একঘেয়েমিতে মোড়া এক রাজকীয়তা এবং অশান্তিময় প্রবোধ। তাঁর কবিতা হয়ে উঠল নাগরিক চক্রান্তের এক অভাবনীয় আলপনা, বাস্তবের মাটি থেকে কৌতুকের হঠাৎ উড়ান। তাঁর কবিতা হয়ে উঠল সভ্য ছলনার আয়োজন ও দর্শনের আশ্চর্য সহাবস্থান। হয়ে উঠল চরম নির্লিপ্তির প্রবল পীড়া এবং একই সঙ্গে পরিকল্পিত পরিহাসের মহাফেজখানা। স্টেটমেন্ট আছে হয়তো কোথাও, কিন্তু বলে দেওয়া নেই। বলে দেওয়া আছে কেবল অবজারভেশনটুকু। সাক্ষ্য-প্রমাণ দাখিল করা আছে কেবল। সেসব জড়ো করে তাকে পড়ে নেওয়া কিন্তু পাঠকের কাজ। হাসান হাফিজ, খুব গোপনে ও চূড়ান্ত সফলভাবে, পাঠককে নিজের কবিতার বাসিন্দা করে নিতে পেরেছিলেন প্রথম থেকেই।
নিরীক্ষায় বরাবর থেকেছে তাঁর সায়। ‘ঘুণ’ থেকে ‘যাত্রা অন্তহীন’ কিংবা ‘কবিতার জন্ম’ থেকে ‘সূর্যোদয়’, ‘২৪ ঘণ্টার বিরহ’, ‘উদাসীনতার বিষ’, ‘যৌথ ভাঙচুর’, ‘দিনগুলি যায়’, ‘বাম পাঁজরের হাড়’, ‘জটিলতার ছুটি’, ‘ক্ষত বিক্ষত’, ‘দীর্ঘ অপচয়’, ‘ছিঁড়ে ফেলি জলপাই শৃঙ্খল’, ‘বিরহ, বড় ভাল লাগে’, ‘অসম বণ্টন’ হয়ে ‘জন্ম জটিলতা’, ‘মুক্তিযোদ্ধার সাথে কথোপকথন’, ‘প্লাস্টিকের ফুল’, ‘আয়না ও ভালোবাসা’, ‘এফিটাফের খসড়া’, ‘অদ্ভুত সঞ্জয়’, ‘কয়লা ও জীবন’, ‘মৌন ব্যবধান’, ‘সর্বহারা’–এমন অসংখ্য নিরন্তর নিরীক্ষার চিহ্ন বহন করেছে তাঁর রচনাসম্ভার। কিন্তু সেসব নিরীক্ষায় কোনো উচ্চকিত বিচ্ছুরণ নেই। কোনো প্রমাণের তাগিদ নেই। আছে গেরিলা অভিযানে কবিতাকে ভেঙে দিয়ে নতুন আঙ্গিক বানানো, বারবার। শব্দকে স্থির রেখে তার ব্যবহারকে আমূল পাল্টে দেওয়ার ছক, বা বাচনভঙ্গিকে দেশলাই বাক্সের মতো ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে কবিতার আধার ও আকার পাল্টে দেওয়ার কৌশল। আমার বারবার মনে হয়, ‘কৌশল’ কথাটি তাঁর কবিতার ক্ষেত্রে খুব জরুরি। অতি পরিচিত, আটপৌরে মোটিফ-এর বাইরে খুব বেশিদূর না গিয়েও চিন্তার শিকড় ধরে টান দেওয়া বা অস্তিত্বের গোড়া নাড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে তাঁর প্রায় প্রতিটি রচনাই। পড়া শুরু করে প্রথমে ঝামেলাটা টের পাওয়া যায় না। মনে হয়, এ তো চেনা ঘরদোরের কথাই বলছে একরকম, এই সমস্ত চরিত্রও তো বিশেষ কিছু নয়। শেষ করেও হয়তো চলে যাওয়া যায় অন্য কাজে। কিন্তু ঠিক ওইখানেই লুকিয়ে রাখা আছে কৌশলখানা। কারণ পরে, অনেক পরে আবার চতুর্গুণ বিস্ময় ও পরাজয় নিয়ে ফিরে আসতে হয় সেই কবিতারই কাছে, তার পাঠ নতুন করে নেওয়ার জন্য। ঠিক যেভাবে, প্রবাদ বলে, অপরাধী একবার অন্তত অপরাধের জায়গায় ফিরে আসে। সেভাবে দেখলে, পাঠকের অপরাধপ্রবণতা নিয়েই কবি হাসান হাফিজের কারবার।
তাঁর কবিতায় রয়েছে অনুভবযোগ্য জগজ্জীবনের স্পষ্টরূপ। তাঁর কবিতায় শব্দগত চটুলতা নেই, হালকা চাল নেই; আছে সহজ-গভীর এক বোধ; যা সহজেই পর্যায়ক্রমিক ও পংক্তিমিলের অনিবার্য কৌশলে এমন এক সাংগীতিক জগৎ গড়ে তোলে, যা পাঠককে সত্তার গভীরে অবগাহন করায় এবং অপ্রত্যাশিত চেতনার জগতে পাঠকের মানসমুক্তিকে ত্বরান্বিত করে।
ব্যক্তি হাসান হাফিজ কখনোই স্রষ্টা হাসান হাফিজকে আড়াল করেননি, তাঁর যাপনটাই সেই রকম। তিনি বাংলা কবিতার জগতের তথাকথিত ওঠাপড়া ও টানাপড়েনের অনেকটাই বাইরে রেখেছেন নিজেকে। তাঁর লেখার টেবিল ও তাঁর পাঠকের মধ্যিখানে কোনো লম্বা করিডর নেই। আমার বিশ্বাস, আমরা কেউই যখন থাকব না, তখনো নতুন দিনের পাঠকরা কবি হাসান হাফিজের কবিতাকে আবিষ্কার করবেন সময়হীন এক বন্দরের মতোই, যেখানে কবিতার ছোটবড় বহু আশ্চর্য জাহাজের অলীক ও নিশ্চিন্ত আনাগোনা।
