রাজিবপুর উপজেলা, কুড়িগ্রামের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা এক জনপদ, যেখানে ব্রহ্মপুত্র নদ প্রতিনিয়ত খেলে চলে প্রলয়ের খেলাঘর। এখানে নদীর স্রোত যতটা বর্ণময়, ততটাই ভয়ঙ্কর। বর্ষা নামলেই নদীর বুকে জন্ম নেয় নতুন নতুন চর, মাটির বুকে আঁকে শোকের রেখা। ভাঙনের বুকে ভেসে যায় মানুষের ঘর, স্মৃতি, শৈশবের দোলনা। আর থেকে যায় কেবল নারীর চোখে স্বপ্নের ফাঁকফোকর। কখনো তা অশ্রুর জলে ভিজে যায়, কখনো তা হয়ে ওঠে বোনা সুতোয় গাঁথা প্রতিজ্ঞার জাল।
এই ভাঙা ভাঙা চর আর প্রলয়ংকরী বাতাসের মধ্যেই জন্ম নিয়েছে ‘অপরাজিতা নকশীপল্লী’। লোকাল গভর্নমেন্ট ইনিশিয়েটিভ অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (লজিক) প্রকল্পের স্নেহছায়ায় গড়ে উঠা রাজিবপুর সদর ইউনিয়নের টাঙ্গালিয়া পাড়া (৭ নং ওয়ার্ড) জলবায়ু ও জীবিকা উন্নয়ন সমবায় সমিতি লিমিটেড যেন রাজিবপুরের নারীর হৃদয়ে এক নতুন সূর্যোদয়। যেখানে নদীর স্রোতের মতোই নিরন্তর বয়ে চলে নারীর সংগ্রাম, বুনে চলে নতুন জীবনের রূপকথা।
প্রতিটি ভাঙন, প্রতিটি বন্যা কেড়ে নিয়েছে ঘরদোর। শীতের সকালে কুয়াশার মতো ঘিরে আসে ক্ষুধা আর অনিশ্চয়তার হিমেল নিঃশ্বাস। তবু এই গ্রামের নারীরা হাল ছাড়েননি। নদীর রুদ্ররূপের কাছে হার মানেনি তাঁদের মমতার শক্তি। জলবায়ু পরিবর্তনের থাবায় যখন শস্যহীন মাঠ ফেটে যায়, তখন জলবায়ু দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত নারীরা হাতে তুলে নেন সুঁই-সুতো আর কাশফুলের ডাঁটি। বানের জলে ভেসে যাওয়া স্বপ্নের প্রতিটি টুকরো তাঁরা বুনে ফেলেন বাটিক প্রিন্টের থ্রি-পিসে, নকশীকাঁথায়, ঝুড়িতে, পাপশে।
অপরাজিতা নকশীপল্লীর প্রতিটি সেলাই যেন নদীর ঢেউয়ের মতোই লেগে থাকে তাঁদের জীবনের বুকে। সুঁইয়ের ফোঁড়ে লুকিয়ে থাকে বানের ভাঙন-দুঃখের প্রতিচ্ছবি। কখনো নিঃশ্বাস ফেলার ফাঁকেও তাঁরা আঁকেন বেঁচে থাকার অমোঘ সুর। জলবায়ু দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত এই নারীরা জানেন, বন্যা যেমন প্রতিবারেই কেড়ে নেয় সব, তেমনি প্রতিবারই তাঁদের সৃষ্টির বীজ রোপণ করে নতুন আশার ক্ষেত।
তাঁরা আজ আর শুধুই কারিগর নন, তাঁরা জলবায়ু সহনশীল নারীর প্রতিমূর্তি। বন্যার রুদ্রতা মোকাবেলায় তাঁরা নিজেদের পণ্য তৈরির প্রক্রিয়ায় এনেছেন নতুন অভিযোজন। তাঁরা শিখেছেন কীভাবে নকশীকাঁথার কাপড়ে স্থানীয় সহজলভ্য উপকরণ ব্যবহার করা যায়, যা পরিবেশের ক্ষতি করে না। তাঁরা কাশফুল আর বাঁশকে কাজে লাগিয়ে নতুনভাবে তৈরি করছেন ঝাড়ু, ঝুড়ি। ভাঙন আর মাটির ক্ষয় রোধে তাঁরা গড়ে তুলেছেন বৃক্ষরোপণ আর সবুজ আচ্ছাদনের ছোট ছোট প্রকল্প।
লজিক প্রকল্পের সহায়তায় তাঁরা শুধু শিল্পের শৈল্পিকতা নয়, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে অভিযোজনের কৌশলও আয়ত্ত করেছেন। প্রকল্পের প্রশিক্ষণ আর সহায়তায় তাঁরা শিখেছেন কীভাবে ঝুঁকিপূর্ণ চরাঞ্চলে টিকে থাকতে হয়, কিভাবে কম জলপ্রয়োজনীয় ফসল বেছে নিতে হয়, কিভাবে জলবায়ুর অভিঘাতকে সৃষ্টিশীলতা আর আত্মমর্যাদায় রূপান্তর করা যায়।
এই নারীদের সৃষ্টিকর্মের বাজার দরকার। সঠিক বিপণন ও ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা না গেলে, একসময় তাঁদের উৎসাহ হারিয়ে যাবে। সরকারি পর্যায়ে (যেমন মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়) এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো (যেমন বিভিন্ন এনজিও, ক্রেতা প্রতিষ্ঠান) যৌথভাবে এগিয়ে এলে জলবায়ু দ্ররা ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের এই সম্ভাবনা বৃহত্তর রূপ নিতে পারে।
কারণ রাজিবপুরের নারীর গল্প জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশ্বিক প্রভাবের বাস্তব উদাহরণ। সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল (SDG)-এর ১, ৫, ১৩, ১৭ নম্বর লক্ষ্য-দারিদ্র্য দূরীকরণ, লিঙ্গ সমতা, জলবায়ু পদক্ষেপ এবং অংশীদারিত্ব, সবই এই প্রকল্পে প্রতিফলিত। আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার সহায়তা পেলে এই মডেল বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়ার সম্ভাব। কেন টিকিয়ে রাখতে হবে এই প্রকল্প? এইবার এই আলোচনায় বসার আসা যাক।
প্রথমত, রাজিবপুরের মতো নদীভাঙনপ্রবণ এলাকার মানুষদের জন্য টেকসই জীবিকা অত্যন্ত প্রয়োজন। লজিক প্রকল্প সেই টেকসই জীবিকার ভিত্তি গড়ে তুলেছে।
দ্বিতীয়ত, এই নারীরা জলবায়ু সহনশীল কৌশল শিখেছেন, এটা জলবায়ু অভিযোজনের আন্তর্জাতিক লক্ষ্য পূরণে সহায়ক।
তৃতীয়ত, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন মানে পুরো পরিবারের অর্থনৈতিক স্থিতি। নদীর ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্গঠনে নারীর আয় প্রধান ভিত্তি।
চতুর্থত, প্রকল্পে ব্যবহৃত কাঁচামাল স্থানীয়-এতে পরিবেশের ক্ষতি নেই, বরং স্থানীয় অর্থনীতি চাঙ্গা হচ্ছে।
পঞ্চমত, লজিক প্রকল্পের মডেল অন্যান্য নদীভাঙনপ্রবণ এলাকায়ও প্রয়োগ করা সম্ভব।
কখনো ভাঙনের ভয়, কখনো বানের তাণ্ডব, আবার কখনো খরার কষাঘাত, এই জনপদের আকাশে বাতাসে লেগে থাকে জলবায়ুর মর্মান্তিক কাহিনী। তবু ‘অপরাজিতা নকশীপল্লী’ যেন এক অদম্য কাব্য, যেখানে নারীর হাতের নকশা আর স্বপ্নের রঙ মিলে ভেঙে ফেলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের অভিশাপ।
সন্ধ্যার অগ্নিসংযোগের আলোয় যখন তাঁরা বসেন কাঁথার ফ্রেমে, তখন নদীর হাহাকার পেরিয়ে শোনা যায় অন্য সুর। মহিলাদের আঙ্গুলে বোনা জীবনগাথা। সুঁই আর সুতোয় সেঁধিয়ে থাকে সন্তানের অন্নের আশা, পরিবারের বেঁচে থাকার গল্প। তাঁরা যেন কেবল শিল্পের কারিগর নন, তাঁরা এই চরাঞ্চলের জলে ডুবে যাওয়া স্বপ্নের বুননকারিনী।
এখানকার বাতাসে ভেসে আসে সেই সৃষ্টির ঘ্রাণ। খোলা চরের ধুলোর মধ্যে, বন্যার মাটি গিলে খাওয়া কৃষিজমির ধ্বংসস্তূপে, আবার জন্ম নেয় সম্ভাবনার অঙ্কুর। আর সেই অঙ্কুর থেকে ফুল ফোটে অপরাজিতা নকশীপল্লীর নারীর হাতের কাজে।
লজিক প্রকল্পের সহায়তা এখানে যেন নদীর তীরে বোনা নতুন বাঁধ-যা ভাঙনের রুদ্রতা সামলায়। তাঁদের প্রশিক্ষণ, আর্থিক সহায়তা আর প্রযুক্তিগত পরামর্শ এই নারীদের আত্মবিশ্বাসের ভিতকে শক্ত করে। পরিবার-সমাজের বুকে তাঁরা ফের ফিরে পান সম্মান আর মর্যাদা।
রাজিবপুরের এই নারীরা নদীর মতোই প্রবহমান-ভাঙে, আবার গড়ে ওঠে। তাঁদের বোনা প্রতিটি শিল্পপণ্য যেন নদীর প্রতিস্রোতের বিপরীতে দাঁড়ানো প্রতিজ্ঞার প্রতিচ্ছবি। এই কারুশিল্প কেন্দ্রের গল্প তাই কেবল তাঁদের নয়, এটি আমাদের সবার, যেখানে প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতকে জয় করে দাঁড়িয়ে থাকে এক উজ্জ্বল ‘অপরাজিতা’।
মোঃ ফরিদুল ইসলাম
শিক্ষার্থী, সংগঠক ও জলবায়ু কর্মী।
মোবাইলঃ ০১৯২৮৬১৪৪৪৬
ইমেইলঃ foridul11islam22@gmail.com
