লেখা: এন এল লাভলু
কি ভাবছেন ছেলে হওয়া এতোটা সোজা , না মশাই না, ছেলে হতে গেলে চোখের জলটাকেই তো প্রথমে বিসর্জন দিতে হয়। তার পর তো যা যা বিসর্জন দিতে হয় তার তালিকা গুলো বলছি, মন দিয়ে শুনবেন কিন্তু ছোট বেলায় স্কুলে যাওয়া থেকে শুরু করে বড় হওয়া অব্ধি আমাদের এটাই শেখানো হয় যে, তুমি ছেলে তাই তোমার কাদবার অধিকার নেই। তাই প্রচন্ড কষ্টেও জলের সাথে লুকোচুরি খেলা শিখে যাই আমরা। কিশোর বয়সে পা দিয়েই, নাকের নিচে হাল্কা গোফের রেখা উঠতেই আমাদের জীবন টা আরো কঠিন হতে শুরু করে। ট্রেনে বাসে যখন দেখি আমার বয়সি মেয়েটা যখন কুকড়ে থাকে নিজেকে বাচাতে, একটু লক্ষ করে দেখবেন আমাদের অনেক ছেলেদের মধ্যেও সেই একই দৃশ্য দেখতে পাবেন। আমরা প্রতিনিয়ত নিজেকে গুটিয়ে রাখি, কারো পায়ে যাতে অনিচ্ছাকৃত ভাবে আমার শরিরটা যাতে ছুয়ে না যায়। কিছু খারাপ পুরুষের জন্য আমাদের প্রতিটা পুরুষ জাতিকেই তুলোধনা করে গালাগাল দেয় সমাজ। আমাদের চুপ থেকে ধৈর্য্য ধরে শুনে যেতে হয়। যেখানে মেয়েদের শেখানো হয় নিজের পায়ে দাড়ানোর জন্য নিজেদের আত্মমর্যাদার, আত্ম সন্মানের জন্য। সেখানে ছোট থেকে আমাদের সেখানো হয়, তুমি নিজের পায়ে দাড়াতে পারলে, হাজার হাজার টাকা ইনকাম করতে পারলে, তবেই তুমি সমাজে উপযুক্ত পাত্র হবে। খবরদার যদি তুমি চাকুরিতা মেয়েকে বিয়ে করতে সপ্ন দেখো তাহলে দুনিয়ায় সবচেয়ে বড় অপরাধ টাই তুমি করে ফেলবে। সমাজের বাকা দৃষ্টি তোমার বেচে থাকাটাই বিষন্ন করে তুলবে। মাঝে মাঝে মনে হয় নিজের জন্য নয় পাত্রীর বাজারে নিজেকে পন্য হিসাবে নিজের দর বাড়ানোর জন্যই আমাদের যত লড়াই। ঠিক এ কারনেই আমাদের অনেক ছেলের প্রেম অংকুরেই বিনষ্ট হয়ে যায়। প্রতিনিয়ত কঠিন বাস্তব আমাদের শিখিয়ে দেয়,চাকরি টা তুমি এখনো পাও নি। তাই এমন সুন্দরী ভালো ঘরের মেয়েকে প্রেমিকা হিসাবে পাওয়ার উপযুক্ত তুমি নও। ব্যাস আরো একটা বিসর্জন। প্রেমের বিসর্জন। আবার সরকারি চাকরি পাওয়ার আশায় দিন গুনতে গুনতে পাশের বাড়ির আমারি বয়সি ব্যাবসায়ী বন্ধুর ছেলেটা লম্বায় প্রায় আমার হাটুর সমান হয়ে গেছে। খুব সৌভাগ্য না হলে তাকেও টিউশনি পড়াতে যেতে হয় আমাদের। প্রতি মুহুর্তে বিসর্জন দিতে হয় আমাদের আত্ন বিশ্বাসকে। বয়স টা তো থেমে থাকে না, আগাছার মতো বাড়েই চলেছে। এরপর যখন ভাগ্যদেবী সহায় হয়ে আমাদের উপর কৃপা দৃষ্টি ফেলেন তখন দেখা যায় বুনো আগাছার মতো আমাদের বয়স বেরে গেছে। আর পাত্রী দেখতে গিয়ে, পাত্র হিসাবে নিজেকে দাড় করাতে হয় সরকারি চাকুরিরত কাকু হিসাবে। আসলে এসব টোল টিটকেরি গুলো হজম করে ফেলি খুব সহজে। কারন কি বলুন তো বেকার শব্দ টা শুনতে শুনতে, সরকারি চাকরি ওয়ালা কাকু তকমা টা যখন নতুন করে গায়ে লাগে, তখন আর আলাদা করে নিজেকে ছোট মনে হয় না। বরং নতুন নামটা বেশ সন্মনের মনে হয়। তাই বলছিলাম জানেন, পুরুষ হওয়া এতোটা সোজা নয়। বাড়ির সবার অভাব মেটাতে গিয়ে নিজের অভাব টা কিসের সেটাই ভুলে যাই আমরা। তবুও কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে এক গাল হাসি নিয়ে দরজায় দাড়াই। সবার অভিযোগ শুনতে শুনতে নিজের অভিযোগ বলার লোক খুজে পাই না। আমাদের একটা বন্ধু থাকে, আমাদের একটা আড্ডা দেওয়ার দল থাকে, আমাদের একটা পাড়ার মোড়ে বসে সমালোচনা করার জন্য চায়ের দোকান থাকে। কিন্তু বয়সের সাথে সাথে সব বিসর্জন দিতে হয় জানেন। বিয়ের পর তো দেরি করে বাড়ি ফেরার জন্য বউ মুখ দেখাদেখি করা বন্ধ করে দেয়। একদিন দুদিন তিন দিনের দিন অশান্তি বাড়ানোর থেকে নিজের আড্ডা মহল টাকেই বিসর্জন দেওয়া শ্রেয় মনে হয়। অবশ্য বন্ধু মহলে এজন্য আমাকে মৌণ বলে এক নতুন নামে ভূষিত হতে হয়। এর পরেও বলবেন বিয়ের পরে ছেলেরা পরাধীন হয় না ? বলেছিলাম না ছেলে হওয়া এতোটা সহজ নয়! জন্মের পর থেকেই দারিদ্র্য শব্দটা খুব অনায়াসে আমাদের সাথে জুড়া যায়। আমারা নিজেদের দায়িত্ব নেওয়ার আগে থেকেই আমাদের সেখানো হয় যে, আমাদের অন্যের দায়িত্ব নিতে হবে। জানেন আমরা কি কি বিসর্জন দেই? একটা কাদা মাখা ফুটবল, একটা ভাঙ্গা উইকেট, একটা মস্ত বড় সবুজ মাঠ, একটা কিশোর বয়সের প্রেমিকা, একটা আড্ডার ডেক। আরো অনেক কিছু। এর পরেও বলবেন আমরা বিসর্জন দিতে পারি না? আমরা আসলে বিসর্জনটা নিঃশব্দে হাসিমুখে দিয়ে যাই তো তাই কেউ তার হদিস পায় না… কখনো খোজ নিয়ে দেখবেন, এক একটা ছেলের বুক পাজরে এক একটা নতুন গল্প বলে যায়।
