মুহাম্মদ রফিকুল ইসলামের নিবন্ধ: অটোপাস

অটোপাস
মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম

দীর্ঘদিন যাবত ছাত্র-শিক্ষক বিচ্ছিন্ন। শিশু শ্রেণি থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা। এই কোভিট-১৯ এর ক্রান্তিলগ্নে বিশেষ করে এস.এস.সি ও এইচ এস সি পরীক্ষার্থীরা উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে এক অনিশ্চয়তার জীবন যাপন করছে।অনেক ছাত্র অাছে যারা জে এস সি তে কোনো কারণে বা এক নম্বরের ব্যবধানে ভালো রেজাল্ট করতে পারেনি কিন্তু ঘুরে দাঁড়ানো তার প্রবল ইচ্ছে আছে এবং আগামীতে যাতে ভালো করতে পারে তার জন্য কঠোর পরিশ্রম করছে।সে পরীক্ষা দিতে না পারলে তার শ্রম ও মেধার পরিচয় দিতে পারবে না।জে.এস.সিতে ভালো রেজাল্ট করেছে কিন্তু এস. এস. সি কোনো কারণে সামান্য নম্বরের ব্যবধানে ভালো রেজাল্ট করতে পারেনি, সে ছাত্র- ছাত্রীরা ঘুর দাঁড়াতে কঠোর পরিশ্রম করছে যাতে সে এইচ.এস.সি তে প্লাস পায়, হয়ত সে পরীক্ষা দিলে প্লাস পেয়ে যেতে পারে।যদি পরীক্ষা দিতে না পারে তাহলে তাকে যদি অটোপাশ দেওয়া হয় তখন সে ভালো রেজাল্ট করা থেকে বঞ্চিত হবে।সে উচ্চ শিক্ষার জন্য মেডিকেল সহ অন্যান্য পাবলিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারবে না।এ ধরনের ছাত্রদের সারা জীবন মনের মধ্যে একটা অপূর্ণতা থেকে যাবে।

এমন অবস্থায় অটোপাশ কতটা যৌক্তিক? তাছাড়া দীর্ঘদিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে ছাত্র-শিক্ষক সমন্বয় না থাকার কারণে এই সময়ের আমাদের আগামীদিনের ভবিষ্যৎ ও আমাদের প্রিয় সন্তানেরা মেধাশূন্য হয়ে যাচ্ছে।

এ হেন অবস্থায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া দরকার। আর সে সিদ্ধান্ত যেন অটোপাশের সিদ্ধান্ত না হয়।অন্য কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হবে।যাতে পরিশ্রমী ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে।ধরে নিলাম কোভিট-১৯ এর ক্রান্তিলগ্ন আরও দুবছর স্থায়ী হলো এ দু বছরেই যদি অটোপাশ দিতে থাকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় তাহলে আমাদের প্রিয় সন্তানেরা মেধাশূন্য হয়ে আগামী দিনে তারা দেশের যে দায়িত্বই পালন করুক তা হবে এক ভয়ংকর অবস্থা যা ভাববার বিষয়।
সচেতন মহল চায় আর কাল ক্ষেপণ না করে বুদ্ধিদীপ্ত কৌশল অবলম্বন করে এখনই সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া দরকার। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবী অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে, এই অনলাইন কতটা ফলপ্রসূ তাও খতিয়ে দেখা দরকার। আমি যখন অনলাইনে পাঠ দিতে যাই তখন অনেক ছাত্রই অংশগ্রহণ করতে পারে না।ডিভাইস এর অভাব,ইন্টারনেটর সমস্যা,সরকার ইন্টারনেটের সুবিধার কথা বললেও বাস্তবে তা অসুবিধাই বেশি।অনলাইনে শিক্ষার নামে অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে যাচ্ছে। নানা ধরনের গেইমে আসক্ত হয়ে যাচ্ছে। তাই এখনই সময় ঘুরে দাঁড়ানোর।পরীক্ষা বিহিন অটোপাশ অসাধুপায় অবল্বনের চেয়েও ভয়ংকর। একটি জাতি,একটি সমাজ,একটি দেশকে ধ্বংস করার জন্য পারমাণবিক বোমার প্রয়োজন হবে না শুধু আগামী প্রজন্মকে মেধাশূন্য করলেই ধ্বংস্তুপে পরিণত হবে। অটোপাশ যেন সে রকমই একটি পারমাণবিক বোমা।২০১৯সাল থেকে ২০২১ সালে পাঠ বিহীন ছাত্র কতটা মেধাশূন্য হয়ে পড়েছে তা যদি সরকার খতিয়ে দেখে যথাযথ পদক্ষেপ না নেন, তাহলে মেধাশূন্য জাতি দিয়ে আস্তে আস্তে এ দেশ ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাবে ফলে আগামীদিনগুলোতে দেশের প্রত্যেকটা সেক্টরে কর্মরত এই অথর্ব মেধাশূন্য জাতির দ্বারা পরিচালিত হয়ে দেশের উন্নয়নের ধারা ক্রমাগত নিম্নগামী হতে থাকবে।সেখান থেকে উঠে আসতে হয়ত আরও পঞ্চাশ বছর লেগে যেতে পারে।তখন সোনার বাংলাদেশ আর সোনার বাংলা থাকবে না, তখন গঠিত হবে অনুন্নত, মেধাশূন্য ভঙ্গুর বাংলাদেশ।এই ক্রান্তিলগ্নে পাঠ বিহীন তৈরি হচ্ছে মেধাহীন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, অর্থনীতিবিদ,শিক্ষক রাজনীতিবিদ।এদের হাতে যখন দেশ পরিচালিত হবে দেশ তখন ডাক্তারের পরামর্শে মরবে রোগী,মেধাহীন শিক্ষকদের দ্বারা তৈরি হবে শিক্ষা ব্যবস্থার অচল অবস্থা, মেধাহীন অর্থনীতিবিদ দ্বারা দেশের অর্থনীতির চাকা বিকল হয়ে যাবে।মেধাহীন রাজনীতিবিদ দ্বারা পরিচালিত হয়ে দেশ যাবে রসাতলে।মেধাহীন ইঞ্জিনিয়ারের দ্বারা পরিচালিত সমস্ত প্রজেক্ট অব্যবস্থাপনার নামান্তর। ধরুন একটা বিল্ডিং এর কাজ ওই মেধাশূন্য ইঞ্জিনিয়ার করেছে তা ধসে পড়ে হাজার হাজার মানুষের প্রাণ যেতে পারে। এটা শুধু উদাহরণ স্বরুপ বললাম।এবার ভেবে দেখুন আমরা কোনদিকে ধাবিত হচ্ছি।ভাবলেই গা শিউরে উঠে। তাই সরকারকে যে কোনো মূল্যে এর প্রতিকারে সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

একজন অভিভাবক হিসেবে বলতে চাই অটোপাশ নয় অ্যাসাইনমেন্ট অথবা যে কোনো মূল্যে পরীক্ষার ব্যবস্থা করে ছাত্রদের ছাত্রত্ব ফিরিয়ে আনতে হবে।ছাত্র,শিক্ষক অভিভাবক সবাই দুশ্চিন্তায় দিনাতিপাত করছে।জাতি যাতে মেধাশূন্য না হয়, সেটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের গভীরভাবে চিন্তা করা দরকার।

লেখক: প্রভাষক, আবৃত্তিকার, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

Share Button