জাফর আহমেদ, কুড়িগ্রাম জেলা সংবাদদাতা:
সোমবার ৩১ আগস্ট: ‘এশিয়ার নোবেল’ হিসেবে পরিচিত ৬৮তম র্যামন ম্যাগসাইসাই অ্যাওয়ার্ড ২০২৬ পেয়েছেন বাংলাদেশের সামাজিক সংস্থা ফ্রেন্ডশিপের প্রতিষ্ঠাতা রুনা খান। প্রান্তিক ও দুর্গম জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন, মানবিক সেবা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাকে এ মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে।
সোমবার (৩১ আগস্ট) বাংলাদেশ সময় সকাল ৯টা এবং ফিলিপাইনের স্থানীয় সময় সকাল ১১টায় রাজধানী ম্যানিলায় র্যামন ম্যাগসাইসাই অ্যাওয়ার্ড ফাউন্ডেশন (আরএমএএফ) ২০২৬ সালের বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করে। ফাউন্ডেশন সেন্টারে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করেন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান এডগার ও. চুয়া এবং প্রেসিডেন্ট সুসানা বি. আফান।
পুরস্কার ঘোষণার প্রতিক্রিয়ায় ফ্রেন্ডশিপের প্রতিষ্ঠাতা রুনা খান বলেন, অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে তিনি এ সম্মান গ্রহণ করছেন। তবে এ স্বীকৃতি তিনি নিজের একার নয়, বরং বাংলাদেশের প্রান্তিক মানুষের পক্ষ থেকে গ্রহণ করছেন।
তিনি বলেন, যারা তাদের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দিয়েছেন এবং ফ্রেন্ডশিপ পরিবারের মাঠপর্যায়ের সহযোদ্ধারা দীর্ঘদিন ধরে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন—এই অর্জন তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল। একই সঙ্গে গত ২৫ বছর ধরে ফ্রেন্ডশিপের কার্যক্রমে যারা আস্থা রেখেছেন ও সহযোগিতা করেছেন, তাদের প্রতিও তিনি গভীর কৃতজ্ঞতা জানান।
রুনা খান বাংলাদেশ থেকে র্যামন ম্যাগসাইসাই অ্যাওয়ার্ড পাওয়া ১৪তম ব্যক্তি। এর আগে বাংলাদেশ থেকে এ সম্মান পেয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস, ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদসহ দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।
প্রান্তিক মানুষের পাশে দাঁড়ানোর স্বীকৃতি
র্যামন ম্যাগসাইসাই অ্যাওয়ার্ড এশিয়ার অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক পুরস্কার। ‘এশিয়ার নোবেল’ হিসেবে পরিচিত এ পুরস্কার মূলত ‘Greatness of Spirit’ বা মানবিক মহত্ত্ব এবং এশিয়ায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে অসাধারণ নেতৃত্ব ও অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে দেওয়া হয়।
ফিলিপাইনের সপ্তম প্রেসিডেন্ট র্যামন ম্যাগসাইসাইয়ের স্মরণে ১৯৫৮ সাল থেকে এ পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে। আগামী ১৫ নভেম্বর ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলায় আনুষ্ঠানিকভাবে ২০২৬ সালের পুরস্কার প্রদান করা হবে।
দুর্গম বাংলাদেশ থেকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
রুনা খানের সামাজিক কাজের শুরু বাংলাদেশের দুর্গম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলকে কেন্দ্র করে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা, বাস্তবতা ও প্রয়োজনকে কাছ থেকে অনুধাবন করে তাদের জীবনমান উন্নয়নে কার্যকর ও টেকসই সমাধান তৈরির লক্ষ্যেই ২০০২ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ফ্রেন্ডশিপ।
একটি ভাসমান হাসপাতাল দিয়ে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, জলবায়ু কার্যক্রম, টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন, অন্তর্ভুক্তিমূলক নাগরিকত্ব ও সাংস্কৃতিক সংরক্ষণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করছে। সংস্থাটির দাবি অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতি বছর প্রায় ৭৫ লাখ মানুষ ফ্রেন্ডশিপের বিভিন্ন সেবা ও কার্যক্রমের আওতায় আসছেন।
ফ্রেন্ডশিপের উন্নয়ন দর্শনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—মানুষকে এমন ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে বাধ্য না করে, মানুষের বাস্তবতা, সক্ষমতা ও প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
এই দর্শনের আলোকে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে প্রশিক্ষিত করা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় কমিউনিটিকে সম্পৃক্ত করা এবং স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জীবিকা, অধিকার ও জলবায়ু সহনশীলতাকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি।
রুনা খানের এ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বাংলাদেশের সামাজিক উন্নয়ন, মানবিক উদ্যোগ এবং প্রান্তিক মানুষের ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে দীর্ঘদিনের কাজ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃতি পাওয়ায় এটি বাংলাদেশের জন্যও গর্বের বিষয়।
