নাগেশ্বরীতে কাপড়ে নকশা ও বুটিকের কাজ করে সাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন নারীরা

জাহিদুল ইসলাম জাহিদ, নাগেশ্বরী:

হাতে প্লাস্টিকের ফ্রেমে বাঁধা শাড়ি ও থ্রি পিচ। তাতে সুই সুতা নিয়ে কেউ শাড়িতে বুনছেন বুটিক করা শাড়ি থ্রি পিচ, কেউবা করছেন কাপরে নকশা, আবার কেউ করছেন সেলাই মেশিনে সেলাইয়ের কাজ। দলবেঁধে গল্প আড্ডায় নারীদের এমন কর্মযজ্ঞ যেনো চোখে পড়ার মতো। সবার চোখে মুখে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন। সংসারে সচ্ছলতা ফিরিয়ে দু’মুঠো ডাল ভাত যোগাবার আর সন্তানদের লেখাপড়া করিয়ে সুশিক্ষিত করে দেশকে এগিয়ে নেবার প্রত্যয় সবার। এ দৃশ্য কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার ভিতরবন্দ ইউনিয়নের জামতলা এলাকায়। এ উপজেলার নারীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে তাদেরকে স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলার এই মহতী উদ্যোগ হাতে নিয়েছেন নারী উদ্যোক্তা সিলেটি কন্যা নাদিরা আবুল কোরেশী।

শৈশব থেকেই আঁকাআঁকি ও নকশা করার শখ ছিলো তার। শখের কাজ দিয়েই দুরন্তপনা কৈশোরে তিনবার তার সাফল্যের ঝুড়িতে জমা হয় জাতীয় পুরস্কার। বর্তমানে স্বামী সন্তান নিয়ে আমেরিকায় রয়েছে সুখের সংসার। কর্মজীবনে সেখানেই আইটি ফার্মে কাজ করছেন তিনি। তবে দেশপ্রেম আর স্বদেশের মানুষদের ভালোবাসা এরিয়ে যেতে পারেননি তিনি। দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি বিশ্ব দরবারে তুলে ধরবার লক্ষ্যে এবং বাংলাদেশের পিছিয়ে পড়া মানুষকে কর্মদক্ষ করে গড়ে তুলে আর্থিক সচ্ছলতা ফিরিয়ে এনে তাদের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছেন এই অদম্য নারী উদ্যোক্তা।
এমন লক্ষ্য নিয়ে নাগেশ্বরীর জামতলা এলাকায় শুরু করেছেন আবুল হোসেন কোরেশী প্রকল্প-২। যে প্রকল্পের মাধ্যমে এ অঞ্চলের নারীদেরকে প্রশিক্ষিত জনশক্তিতে রূপান্তরিত করে তাদের পরিবার ও নিজ এলাকাকে আর্থিকভাবে চাঙ্গা করা। আর তাই এসব নারীদেরকে কাপড় বুনা, কাপড়ে নকশা করা, বুটিক করা, শাড়ি-থ্রিপিস তৈরীসহ জাতীয় পর্যায়ের প্রশিক্ষক দ্বারা নানা বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করে তাদেরকে আরও পাকাপোক্ত করে তুলছেন তিনি। যে প্রশিক্ষনের মাধ্যমে প্রশিক্ষিত নারীদের হাতে তৈরি পোষাক দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা ও বাইরের দেশের রপ্তানি করে দেশের অর্থনীতির চাকা চাঙ্গা করছেন তিনি।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় আবুল হোসেন কোরেশী প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত প্রায় ৯০ জন নারী তাঁদের মনের মাধুরি মিশিয়ে শাড়ি ও থ্রি পিচে সুই সুতা নিয়ে বিভিন্ন ধাচের নকশা বুনে আকর্ষনীয় রূপ দিচ্ছেন। শুধু তাই নয়, নারীদের হাতে তৈরী পণ্য বাজারজাত করতে শাটী নামে একটি ব্র্যান্ডও প্রতিষ্ঠা করেছেন নাদিরা। আর এই শাটীর মাধ্যমে বাঙালিয়ানা এসব পণ্য পণ্য দেশের গন্ডি পেরিয়ে ইতোমধ্যে বাইরের বিভিন্ন দেশে যেমন শোভা ছড়াতে সক্ষম হয়েছে। এসব পণ্য থেকে আয়কৃত অর্থও এসব নারী ও তাদের সন্তানদের ফেরত দেন নাদিরা কোরেশী। শুধু তাই নয়, এই সকল পরিবারের মেয়েদেরকে স্কুল-কলেজ মুখী করার জন্য নিয়মিত শিক্ষাবৃত্তি দিয়ে উৎসাহিত করছেন নাদিরা। এমনকী তাদের জীবন যাত্রার মান উন্নয়নে তাদেরকে কম্পিউটার ও আইটির উপরও দক্ষ করে গড়ে তুলে সমাজের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দিচ্ছেন তিনি।


আবুল হোসেন কোরেশী প্রকল্পে প্রশিক্ষণ নেয়া অনার্স প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী হাওয়া খাতুন জানায়, তার পরিবার অসচ্ছল। তাই তিনি এখানে প্রশিক্ষণ নিয়ে সাবলম্বী হয়ে পরিবারের দায়িত্ব নিতে চান। আর পাশাপাশি নিজের পড়াশোনার খরচ চালিয়ে যেতে চান তিনি। জামতলা এলাকার সিরাজাম মুনিরা মিষ্টি জানান, তার স্বামী মারুফুর রহমান একজন বেকার। কাজ না থাকায় সংসারে অভাব অনটন লেগেই থাকে তাদের। তাই এখানে শাড়ি থ্রি-পিচের বুটিকের কাজ করে সংসারে সুখ ফিরিয়ে আনতে চান তিনি। সন্তানদের লেখাপড়া করিয়ে মানুষের মতো মানুষ করতে চান।
নারী উদ্যোক্তা নাদিরা আবুল কোরেশী বলেন, দেশের গ্রামীণ এলাকার পিছিয়ে পড়া নরীদেরকে জনশক্তিতে পরিণত করতে তাদেরকে প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মমূখী করতে চাই। যাতে করে নারীরা আয় করে সংসারে সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখতে পারেন।

Share Button