কুড়িগ্রামে নদীভাঙনের শঙ্কা ঘনাচ্ছে : ঝুঁকিতে হাজারো পরিবার

জাফর আহমেদ, কুড়িগ্রাম জেলা সংবাদদাতা:

বর্ষা মৌসুমের আগমনী সুরের সঙ্গে সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের সীমান্তবর্তী জেলা কুড়িগ্রামে আবারও তীব্র হয়ে উঠছে নদীভাঙনের আতঙ্ক। জেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া পাঁচটি প্রধান নদী—ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা, দুধকুমার ও গঙ্গাধর—ঘিরে পাড়জুড়ে বাড়ছে উদ্বেগ। গত বর্ষায় প্রায় দুই হাজার পরিবার ভিটেমাটি হারানোর পর এবারও কয়েক হাজার পরিবার একই পরিণতির আশঙ্কায় দিন গুনছে।
সরেজমিনে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, গত বছরের ভাঙনের ক্ষত এখনো শুকায়নি। চরপার্বতীপুর ও বানিয়ারপাড়া গ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকায় বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। অনেক পরিবার ইতোমধ্যে আগেভাগেই ঘরবাড়ি সরিয়ে নিতে শুরু করেছে। যাদের বিকল্প আশ্রয়ের ব্যবস্থা নেই, তারা চরম অনিশ্চয়তায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিবছর ভাঙন শুরু হলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কিছু তাৎক্ষণিক উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে রূপ নেয় না। ফলে নদীভাঙন একটি স্থায়ী দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। বর্ষা এলেই নতুন করে শুরু হয় মানুষের দুঃসহ জীবনসংগ্রাম।
যাত্রাপুর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য আব্দুল আউয়াল ও ৫ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য মাহাবুব আলম বলেন, গত কয়েক বছরে তাদের এলাকায় হাজারো পরিবার বসতভিটা হারিয়েছে। এবারও শতাধিক পরিবার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে বসতভিটার পাশাপাশি ফসলি জমি, স্থানীয় হাটবাজার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কুড়িগ্রাম জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফা বলেন, “প্রতিবছর একই চিত্র—মানুষ সব হারাচ্ছে, কিন্তু স্থায়ী সমাধান আসছে না। নদীভাঙন রোধে সরকারের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা এখন সময়ের দাবি।”
জেলা পরিষদ প্রশাসক ও জেলা বিএনপি সদস্য সচিব আলহাজ্ব সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদ বলেন, “নদীভাঙন ও চরাঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ নিরসনে জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন নিশ্চিত না করলে এই সংকট আরও গভীর হবে।”
কুড়িগ্রাম জেলা চর উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন, “নদীভাঙন শুধু ভূমি হারানোর বিষয় নয়; এটি মানুষের জীবিকা, শিক্ষা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। চরাঞ্চলের মানুষের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও বিজ্ঞানভিত্তিক নদী ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা জরুরি।”
জেলা উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক সাইয়েদ আহমেদ বাবু বলেন, “কুড়িগ্রামের টেকসই উন্নয়নের জন্য সমন্বিত নদীশাসন, পুনর্বাসন এবং চর উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি।”
এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিবুল হাসান জানান, আসন্ন বর্ষায় ভাঙন ঠেকাতে নদী অববাহিকার ১৯ কিলোমিটার অরক্ষিত এলাকায় অস্থায়ী প্রতিরোধ হিসেবে এক লাখ জিওব্যাগ বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। ভাঙনপ্রবণ এলাকাগুলোতে এসব জিওব্যাগ ব্যবহার করা হবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, কুড়িগ্রাম জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত ১৬টি নদ-নদীর মধ্যে পাঁচটি প্রধান নদীর দুই তীরের মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৩৭৪ কিলোমিটার। এর মধ্যে প্রায় ৩০৮ কিলোমিটার নদীতীর এখনো অরক্ষিত রয়েছে, যা প্রতিবছর ভাঙনের বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীভাঙন রোধে সাময়িক উদ্যোগ নয়, প্রয়োজন টেকসই ও সমন্বিত পরিকল্পনা। শক্তিশালী নদীশাসন, স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ, কার্যকর পুনর্বাসন এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা না গেলে প্রতি বর্ষাতেই কুড়িগ্রামের মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে।

বর্ষার আগেই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যর্থ হলে কুড়িগ্রামে আবারও দেখা দিতে পারে মানবিক বিপর্যয়। তাই এখনই সময়—পরিকল্পিত নদী ব্যবস্থাপনা ও স্থায়ী সমাধানের মাধ্যমে মানুষের জীবন ও জীবিকা রক্ষায় দৃশ্যমান উদ্যোগ নেওয়ার।

Share Button