কুড়িগ্রামে থামছেই না বাল্যবিয়ে || এক বিদ্যালয় থেকেই ঝরলো ৮৫ শিক্ষার্থী

হাফিজুর রহমান হৃদয়:

কুড়িগ্রামে ঠেকানো যাচ্ছে না বাল্যবিয়ে। দিনকে দিন হুহু করে বেড়েই চলছে এর প্রভাব। ফলে কমে গেছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর উপস্থিতিও। এতে হতাশ শিক্ষক ও সুধিমহল। করোনাকালীন দের বছর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় এক স্কুল থেকেই বাল্য বিয়ে হয়েছে ৮৫জন শিক্ষার্থীর। অল্প বয়সেই স্কুলের ক্লাস করার বদলে তারা এখন ব্যস্ত স্বামীর ঘর সংসারে। সুধিমহল বলছেন কলি হয়ে ফুটতে না ফুটতেই ঝরে পড়লো এসব ফুল। আর তাই কমে গেছে ওই স্কুলের ক্লাসে উপস্থিতির হার। অধিকসংখ্যক এই বাল্য বিয়ের কবলে পড়েছে জেলার ফুলবাড়ী উপজেলার বড়ভিটা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। বাল্যবিয়ের এই ছোবলে হতাশ শিক্ষকরাও।

সচেতনমহলের দাবি, যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতাসহ নানা প্রতিবন্ধকতার জন্য হু-হু করে বেড়েই চলেছে এ উপজেলার বাল্যবিয়ের হার। কোন ক্রমেই ঠেকানো যাচ্ছে না এই বাল্যবিয়ে। তবে জরিপ করে প্রকৃত বাল্যবিয়ে এবং শিশু শ্রমের শিকার শিক্ষার্থীর সংখ্যা নির্ণয় করে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ^াস দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রতিষ্ঠানটির প্রধান শিক্ষক মূহা. মতিউর রহমান খন্দকার জানান, তার বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থী ৩শ ৪৫ জন। এর মধ্যে ৮৫ জনের বাল্যবিয়ে হয়ে গেছে। তবে এ বিষয়ে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। তিনি আরও জানান বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে-৬ষ্ঠ শ্রেশিতে ২, সপ্তম শ্রেণিতে ১১, অষ্টম শ্রেণিতে ১৭, নবম শ্রেণিতে ২৮, দশম শ্রেণিতে ১৪ এবং চলতি বছরের এস এস সি পরীক্ষার্থী ১৩ জন। করোনা মহামারীর কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার আগে এই বিদ্যালয়ে প্রতিদিন গড়ে শিক্ষার্থীর উপস্তিতি ৭০ থেকে ৯০ শতাংশ হলেও এখন উপস্থিতি হচ্ছে ৪০-৫০ শতাংশ।

ওই প্রতিষ্ঠানের অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষার্থী নূপুর, আশামনি, নাছিমা ও আতিকা খাতুনসহ অনেকেই জানায়, তারা ১২ সেপ্টেম্বর বিদ্যালয় খোলার প্রথম দিনেই তাদের ১৭ জন বান্ধবীর বিয়ে হওয়ার খবর শুনে তাদের সবার মন খারাপ হয়ে যায়। অনেক দিন পর বিদ্যালয় খোলার আনন্দের চেয়ে মন খারাপই বেশি ছিল তাদের। এ নিয়ে নিজের ভাবিষ্যৎ নিয়েও দুশ্চিন্তায় রয়েছেন বলেও জানান তারা।
নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থী সুমী আক্তার জানায়, অনেকদিন পর স্কুল খুললো, সব বান্ধবীর সঙ্গে মজা করবে, আনন্দ করবে কিন্তু সেটা আর হলো না। স্কুল এসে দেখে ২৮ জন বান্ধবী স্কুলে আসেনি। এতে ভিষণ মন খারাপ হয় তার। পরে জানতে পায় ২৮ জন বান্ধবীসহ স্কুলের ৮৫ থেকে ৯০ জন শিক্ষার্থীর বাল্যবিয়ে হয়েছে। তার ভাগ্যে কী আছে জানে না সে। তবে বাল্যবিয়ে চায় না সুমি আক্তার।
ঐ প্রতিষ্ঠানের বাল্যবিয়ের শিকার নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থী বিথী খাতুনের বাবা ভ্যান চালক বাদশা মিয়া বলেন, বাহে আমরা গরীব মানুষ। ভ্যান জীবন চলে, সংসার চালাই। জানেনতো গরীব মানুষের দোষ বেশি। ভাল একনা আলাপ আসছে এই জন্যে বেডিটাক বিয়াও দিছং।

বাল্যবিয়ের শিকার নিলুফা ইয়াসমিনের বাবা বাই সাইকেল মেকার বাবলু মিয়া বলেন, দেখতেছেন তো কোন রকম মানুষের সাইকেল ভাল করিয়া যা পাই তা দিয়েই কোন রকমেই সংসার চলে। দেশোত করোনা আসিয়া আমরা খুব কষ্টোত ছিলোং। কোন সহযোগিতাও পাই নাই। বেডিটাও বড় হইছে। এই নিয়া দুশ্চিন্তার শ্যাষ নাই। তা একনা ভাল সমন্ধ পাওয়ায় আর দেড়ি করি নাই । সাথে সাথে মেয়েটার বিয়ে দিছি। বাল্যবিয়ে দেওয়াটা আমরা ভুল করছি।

এ ব্যাপারে বড়ভিটা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মুহা. মতিউর রহমান খন্দকার বলেন, বিদ্যালয় খোলার পর শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কম থাকায় আমরা শিক্ষকরা প্রতিটি শিক্ষার্থীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজ খবর শুরু করেছি। যে সব শিক্ষার্থীর বিয়ে হয়ে গেছে আমরা তাদের বাড়িও যাচ্ছি। ওইসব শিক্ষার্থী যাতে স্কুলে আসে সে ব্যাপারে তাদের অভিভাকদের সচেতন করছি। করোনার কারণে দীর্ঘদিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় তারা পড়াশুনা থেকে পিছিয়ে পড়েছিল। এই সুযোগে পরিবার তাদের বাল্যবিয়ে দিয়েছেন। আমরা শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়মুখি করার জন্য কাজ করছি।

ফুলবাড়ী উপজেলার বড়ভিটা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. খয়বর আলী জানান করোনার কারণে আমার ইউনিয়নে বাল্যবিয়ে বেড়েছে। আমরা এজন্য পদক্ষেপ নিচ্ছি। প্রশাসনের সহযোগিতায় আমরা পাড়া-মহল্লায় বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে মতবিনিময়সহ সচেতনতামূলক প্রচার চালানো হবে।

ফুলবাড়ী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো.আব্দুল হাই জানান বড়ভিটা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের বাল্যবিয়ের তথ্যটি পেয়েছি। এ উপজেলায মোট ৭৩ টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, এ সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে। বাল্যবিয়ের প্রতিরোধে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অভিভাবকদের সাথেও মতবিনিময় করে বাল্যবিয়ের বিরুদ্ধে ব্যাপক জনসচেতনতা বাড়াতে শিক্ষকদের নির্দেশ দেওয়া হয়ছে বলেও জানান তিনি।

ফুলবাড়ী উপজেলা নির্বাহী অফিসার সুমন দাস জানান, তিনি বড়ভিটা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ৮৫ জন শিক্ষার্থীর বাল্যবিয়ের বিষয়টি শুনেছেন। বাল্যবিয়ে কিভাবে প্রতিরোধ করা যায় সে বিষয়ে সভা-সমাবেশসহ বিভিন্ন ধরণের প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে আমরা কাছ শুরু করেছি। প্রতিটি ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধিসহ সুশীল সমাজর প্রতিনিধিকে নিয়ে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহŸান করা হচ্ছে। সেই সাথে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়মুখি করার কাজ করা হচ্ছে।

Share Button